দেশের ভয়াবহতম গাইসাল রেল দুর্ঘটনার ২০ বছর পর ভারাক্রান্ত স্মৃতিচারণে সাংবাদিক

বিশ্বনাথ সিংহ

আগস্ট, ১,২০২০: আজ থেকে ২০ বছর আগে আজকের দিনে ঘটে ভারতের সবচেয়ে বড় ট্রেন দুর্ঘটনা।


আজ থেকে ২০ বছর আগে. ভোর ৪ টেতে খবর পেলাম। দুটো ট্রেন মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। জেলা পরিষদের সভাধিপতি প্রয়াত নির্মল মুখার্জি এবং জেলা শাসক মিষ্টার প্রশান্ত দুজনের কাছ থেকে ফোন করে কনফার্ম হলাম। বৃষ্টিও পরছে। রবিদার ট্যাক্সি নিয়ে ছুটলাম সেই অভিসপ্ত গাইসাল। ১৯৯৯ সালের ১ লা আগষ্ট আজকের দিনে ভারতের সবচেয়ে বড় ট্রেন দুর্ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলা গাইসাল হয়েছিলো। টেকনোলজি এত উন্নত ছিলো না। “নোকিয়া ১৫” কালো একটা মোবাইল সম্বল। আবার সেই আমরা তিন জন। অলিপ মিত্র, উত্তম পাল, আমি। হ্যা বড় দুর্ঘটনা। কি খবর হবে, কি খবর হবে বুঝতেই পারছি না। তখন তো অতটা ধারণা ছিলো না, কোন খবর জাতীয় স্তর কোন খবর আন্তর্জাতিক স্তরে!! খবর পাঠাতেই হবে, ছবি পাঠাতেই হবে। কি করে খবর পাঠাবো?কি করে ছবি যাবে? কি দুশ্চিন্তা! আবার অফিস থেকে বার বার ফোন। তখন এন্ড্রয়েড ফোনও নেই, ল্যাবটবও নেই। হাতে আছে শুধু একটা আগফা ক্যামেরা। একটা রিল ভরলে ১৬ টা ছবি উঠবে। সেটা আবার যত্ন করে ষ্টুডিওতে নিয়ে যেতে হবে। ওয়াস করতে হবে। তারপর ফটো হবে। সেই ফটো স্কান করতে হবে। টেলি ব্যবস্থা ভালো নয়, রায়গঞ্জে ফিরে ছবি করে সেই ছবি পাঠানো যাবে না। বিকেলেই ছুটলাম শিলিগুড়িতে। রাত ১০ টায় কোনো রকমে বিধান মার্কেট থেকে একটা ছবি পাঠালাম। একদিকে ছবি স্কান করতে দিয়ে ট্যাক্সিতে বসে বসে কালো কালি দিয়ে সাদা কাগজে খবর লিখে ফ্যাক্স করতে গিয়ে দেখি ফের বিপত্তি। বৃষ্টির জন্য ফ্যাক্স মেসিন খারাপ হয়ে গেছে। অগত্যা হাতে লেখা খবর টাও স্কান করে কোনোরকমে ইন্টারনেটে পাঠালাম। ২ রা আগষ্ট গণশক্তির প্রথম পাতায় খবর ছবি প্রকাশিত হলো। রবিদা আর আমি শিলিগুড়ি থেকে ফের রাতেই আবার গাইসালের ঘটনা স্থলে। অল্প বয়স। জাতীয় স্তরের খবরে খাওয়া ঘুম সব ভুলে গিয়ে ডেডবডি নিয়ে পরে থাকলাম। পচা গন্ধ মৃতদেহ গুনছি। এবার কি গণ কবর হবে? কলকাতা থেকে একটা ফোন পেলাম। ক্যামেরাতে যে রিল আছে সেই রিল টা কলকাতা গামী একটা বাসের ড্রাইভারের কাছে দিয়ে দিতে হবে। সকালে কেউ এসে রিল নিয়ে নেবে। দিয়ে দিলা। হাতে আছে মাত্র একটা রিল। সকালে দুর্ঘটনা দেখতে রেল মন্ত্রী নীতিশ কুমার আসছেন। এলাকায় থাকতে হবে নির্দেশ ছিলো। আকাশ পানে তাকিয়ে আছি। কখন রেলমন্ত্রী আসছেন। জেলা শাসক আই সি, ডি আর এম এদের সাথে স্টেশনে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা সেরে নিয়েই দুর্ঘটনায় দায় কাধে নিয়ে গাইসাল ষ্টেশন থেকেই রেল মন্ত্রীত্ব থেকে ইস্তফা দিলেন। ভয়ঙ্কর রেল দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু চোখে দেখে ছিলাম। গভীর রাতের অন্ধকারে অনেক মৃত মানুষের উপর হুমড়ি খেয়ে পরেছিলাম। তিন দিন পর বাড়ি ফিরেছিলাম। ক্লান্ত বিধ্বস্ত বিছানায় শুয়ে শুয়ে মানুষের আর্তনাদ কান্না দুই দিন ধরে কানে ভাসছিলো। সেদিনের একের পর এক ঘটনা আজও মনে পরলে শিউরে উঠি।

Leave a Reply