LockDownDiary19: আইসোলেশন কবিতাগুচ্ছ


আমার আত্মার কসম
আমি এ লাশ
ফেলতে পারবো না।
এ লাশ আমার বোন ছিলো
অনেক বছর
এ লাশ আমার ভাই ছিল
অনেক বছর
এ লাশ
আমার পড়শী ছিলো
আশি টা বছর
আমি এ লাশ ফেলতে পারবো না
আমি বসে আছি
গায়ে জ্বর
কেউ কেউ চলে গেছে
আমি আছি
আমিও লাশ হবো
এ লাশের সাথে যোগ হবো
এম্বুলেন্স আসলে যাবো
না এলেও যাবো
সকলেই গেল
এ শহর ফাঁকা করে
অন্য কোথাও দালান উঠবে
এখানে মরে গেলে
হাসপাতাল হবে
বাড়ির উঠোন ভরে
কচি ঘাস হবে
লাশের সারে বেড়ে যাবে দ্রুত
তখন হাসপাতালগুলো
প্যাথলজি করে
লিখে যাবে
সর্দি ছিলো
জ্বর ছিলো
কাশি ছিলো
হাঁপানি
চিনি রোগ ছিলো
হার্টের সমস্যা ছিলো
ওরা সব আদ জাতির মতো
গজবেই মরে গেছে।

২.
হাতড়ে বেড়াই ভাই
হাতড়ে বেড়াই বোন
সন্তান
মা
জনগণ
অতি সাধারণ
না
কেউ আর নেই।

আইসলেশন।

কেউ আর নেই
ভাই নেই
চাল নেই
রান্নার
কান্নার কেউ নেই
চোখের জল নেই
মৃত্যুর তল নেই।

হাতড়ে দেখি পালস
হাতড়ে দেখি নিজেকেই
হাতড়ে দেখি বোন।
নেই।

আইসলেশন।

বুক ভরা কাশি
হাঁচি
জ্বর
কষ বেয়ে বয়ে যায়
সমুদ্রে বয়ে যায়
হাতে আর হাত নেই।
ভাতের থালায় ভাত নেই।

আইসলেশন।

জলের বাটিতে জল স্থির
মল পেটে স্থির
গাছে পাতা স্থির
শকুনের
শেয়ালের
চোখ
জ্বলজ্বল
জ্বলছে
শিমূল গাছ থেকে
নেমে আসছে অজস্র শকুন
ওরা উড়ছে
ওরা নামছে
যেন এরোপ্লেন
শেয়ালের
কুকুরের চোখে
ভয়
আর নয়
আর নয়
ভয় গোটা আকাশ ভূমিতে
জীবন কোথায়?
মৃত্যুর উৎসবে
কার পরাজয়?

আইসলেশন।

হাতড়ে দেখি ম্লান চাঁদ
হাতড়ে দেখি তারাদের
হাতড়ে দেখি
তুমি হিম
হাতড়ে দেখি
মরা নিম
কালোজিরা মধু পান
কফি হাউজের সেই গান
সে আমার ছোটবোন
কিছু আর নেই।

আইসলেশন।

কাঁদবো কোথায়
ভরা বুক
কাঁদবো কোথায়
উজবুক
হাতড়ে দেখি
ছোট ভাই
হাতড়ে দেখি
সন্তান
হাতড়ে দেখি
ছোট বোন

কেঊঊঊঊঊঊঊঊ নেই।

আইসলেশন।


কি মিষ্টি বাতাস
কেবল সকালের আগে
কোথাও আজান হলো
মসজিদে এসো না
মন্দিরের ঘন্টা বাজলো
গির্জার ঘন্টা বাজলো
তোমরা ঘরে থাকো
ভোজনালয়ের গেটে ভিক্ষুক
ভেতর থেকে কেউ বের হলো না
কেউ ঢুকলো না
এ শহরে কোথাও কেউ নেই
আইসলেশন
কোথা থেকে কোথা
ভিক্ষুকটা
একা বসে কয়েকটি টাকা বের করে
খাদ্য পেলো না ।
মানুষ পেলো না
হয়তো আইসলেশন
নয় তো
গোরস্তানে।


অখণ্ড নীরবতা নামে পথে পথে তুমি ছাড়া আর সঙ্গী পাবে না
এমনি আঁধার কেউ কাউকে দ্যাখে না
অথচ লোক হাঁটছে, লোক যাচ্ছে, লোক জন্মায়
লোক মরছে
এখন কারা যেনো চুপচাপ অজস্র কফিন
কাঁধে নিয়ে
গির্জায় রেখে চলে যাচ্ছে
মসজিদে জানাজা হচ্ছে না
লাশ জমছে লাশ যাচ্ছে
খাল কাটছে
ক্রেন নামছে
ক্রেন উঠছে
ফের নেমে
মাটি কাটছে
মানুষ এখন মানুষ দেখছে না
কেউ এসে গল্প বলছে না
কষ্টের কথার বদলে
ঘরে ফিরে যাওয়া
ঘরের আঁধারে
নারীকেও নাড়ে না।
অদ্ভুত আঁধার কাল
ট্রেন নেই
পড়ে আছে জং ধরা লম্বা লাইন
শুধু এম্বুলেস আর ক্রেন
শুধু রাস্তায় সিটি
এম্বুলেস আর ক্রেন
আর প্যাগোডায় হলুদ কাপড়
তার নিচে কেবলি মানুষ
এখন আঁধার
পথে এম্বুলেন্স খালি প্যাগোডা
ক্রেন উঠছে মাটি কাটছে লাশ ফেলছে
কেবলি মানুষ।


মনের কোঁচায় ভাই
ভাত নাই
কাজ নাই
মনের কোঁচায় মৃত্যু ঘুমায়
বোনটা এলেই খাবে
যাবে।
যাচ্ছে দ্রুত
স্পেন ইতালি
ব্রিটেন
ঘরের কোন
রায়গঞ্জে মানুষ মরে
চিতায় আগুন
ঠাকুরগাঁও এর সংবাদ কি?
বরিশাল
সদ্যুল্লাপুর
কুড়িগ্রাম
কোথাও নেই সরঞ্জাম
কে দেখবে?
কে দেখবে?
গা ছাড়া মানুষ
ভাই ছাড়া বোন
গগনবিদারী চিৎকার বৃদ্ধের
কোথায় কবর?

সর্দি শুনেই হাসপাতাল
বলছে সিট নেই
তুমি আমার ভাই
বাড়ি যাও
কালোজিরা মধু খাও।

কোথায় মানুষ?
চারদিক বন্ধ
কান মলছে রিকসাপুলার
বাজারে নিমটি খাটে
বালকের কাজ নেই
বাড়ির মোড়ে মোড়ে
মাটি কাটা লোক
সে খোঁড়া কবর হোক
করছে মানুষ
দশগুণ ভাড়ায় ছুটছে
এম্বুলেন্স
নির্বাক মিরজাদী
কোনো রোগী আসে নাই
প্রেস ব্রিফিং তার
অথচ কবর খোঁড়ার
নেই কো বিরাম।

ছেলেহীন মা
একা হাঁপায়
কাশে
পাশে শুয়ে স্বামী
জ্বরে মাথায় জল ঢালে
সেও অচল কাশছে
অবিরাম।

কাশতে কাশতে যায়
উজাড় করে যায়
দেখবে মিরজাদী
এই বাংলায়
কত মৃত্যু একটু শ্বাসের জন্যে
নাই।

তুমি আমায় বোন
তুমি আমার ভাই
ভাত দেবো
কাপড় দেবো একুশদিন
ঔষধ নাই
অক্সিজেন নাই
মাপার কিটগুলি
হাইফাই মানুষের
মানুষ নিত্য কিনছে
শ্বাস
আরো শ্বাস দরকার
আর শ্বাস নেই।
ছাব্বিশের রাতে
বোন মরলো
শ্বাসের অভাবে
আমিও নির্বিকার মানুষের চোখ ঘোলা
আকাশ দেখছে চেয়ে চেয়ে
যদি নামে দয়া।

৬.

মেয়েটি

লেপ তোষকের মতো

আখের গুছাতে

রাতের পরে দিন

দিনের পরে রাত

মেয়েটির শরীরে আঁচলে

চাবি বাড়ছে

সিন্দুক ভরা পত্র সব

যাচাই বাছাই শেষ

হয়নি কিছুই

শুধু গুছিয়ে যাওয়া তার

মাঝে মাঝে মহামারী আসে

মানুষ

গুছাতে চায়

হয় থেকে নাই

নাই থেকে হয়

যা কিছু পায়

মহামারী আসে

মানুষ তাহার ভেতর চাল ডাল

নুন তেল আটা সোটা

সকল গুছাতে চায়

কেবল রাস্তায়

লাশগুলো

তারা ফেলে রেখে

দীর্ঘ ছুটিতে 

দীর্ঘ পথ জলে তলে ও আকাশে

পার হয়ে আরেক নগরে

পিকনিক মুডে সকলে বেড়াতে যায় লাশগুলো পড়ে থাকে

সদরে অন্দরে গির্জা মসজিদে প্যাগোডায় মানুষ মহান পিকনিকে দূর দেশে যায়।

ভাস্কর চৌধুরী,কবি, ঢাকা, বাংলাদেশ

Leave a Reply