বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 2, 2023
বাড়িকুলিক রোববারকুলিক রোববারে আজকের গল্প অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী-র 'নবমী'

কুলিক রোববারে আজকের গল্প অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী-র ‘নবমী’

১৭/২/২০১৯, কুলিক রোববার :

নবমী

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী

নবমীর সন্ধ্যা। আলোয় আলোয় আকাশ ঢাকা। আকাশ কেন, আকাশ পথ ঘাট সব ঝকমক করছে। দোকান বাজার রেস্টুরেন্ট সব মুখরিত। কিন্তু তাপসের এই জাঁকজমক দেখতে দেখতে চল্লিশ বছর আগেকার এক নবমীর কথা মনে পরে। আসলে প্রত্যেক নবমীতেই ও ফিরে যায় সেই দিনটিতে।
তাপস খুব গরিব ঘরের ছেলে। এই শহরে এসেছিল “এলাবেলা” কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে শিক্ষকের চাকরি পেয়ে। খুব নামকরা স্কুল। নাচের, গানের, সেলাই-এর স্কুলও একসাথে। সব কিছুর শিক্ষক মিহিরবাবু। এমন গুণী মানুষ একশ বছরে একটা জন্মায় না বলেই তাপসের বিশ্বাস। কিন্তু সব গুণের পেছনে কিছু অগুণ থাকে। মিহিরবাবুর একটাই মাত্র অগুণ ছিল, তিনি ছিলেন “হাফ লেডিস” । তার চালচলন ছিল সেই সময়ের মফস্বল শহরটার অন্যতম প্রধান চর্চার বিষয়। হাতে সব সময় উলের ব্যাগ থাকত। উলকাঁটা বুনতে বুনতে সেই কোমর দুলিয়ে হাঁটা —-। এখন কোন মেয়েদের হাতে আর সেভাবে উলকাঁটা দেখা যায় না। কিন্তু তখন দেখা যেত, যেখানে মিহিরবাবু বসে আছেন সেখানেই তাকে গোল করে ঘিরে আছে মহিলা মণ্ডলী । উদ্দেশ্য একটাই, সোয়েটারের ডিজাইন দেখে নেওয়া শিখে নেওয়া। এই মহিলারা সকলেই ছিল তার স্কুলের ছাত্র ছাত্রীর মায়েরা। বিশাল উঠনে নাচের প্র‍্যাক্টিস করত মেয়েরা। তিনি উঠে এসে মাঝে মাঝে দেখিয়ে দিতেন। অত্যন্ত স্নেহ প্রবণ মানুষটি তাপসের উপর একটু বেশি সদয় ছিল। তাপসকে কিন্ডারগার্টেন-এর হেডমাষ্টার করে দিলেন। তাপসের জ্বর জারি অথবা যেকোন অসুবিধায় তিনি প্রাণ দিতেন। ধীরে ধীরে বয়স হচ্ছিল কিন্তু উদ্যমের কোন অভাব ছিল না। যতই আড়ালে তাকে নিয়ে হাসুক সকলে, শহরে ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। একবার নাকি একটা গরু তাকে গুঁতো মারতে এসেছিল। মিহিরবাবুর হাতে ছিল একটা গোলাপ ফুল। তিনি বলেছিলেন, এই গরু সর না, না হলে এই ফুলটা ছুঁড়ে মারব। এই গল্পটা সেই সময় অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। কতটা সত্যি তা অবশ্য জানে না তাপস।
শ্রাবন মাসে বিয়ের জন্য দু’মাসের ছুটি নিয়েছিল তাপস। কালী পুজার পর স্কুলে জয়েন করার কথা। যেহতু চাকরী পাওয়ার পর তিন বছরের মধ্যে একবারও ছুটি নেয়নি এই ছুটিটা একটু বেশিই লম্বা নিল। তাপস যখন যাচ্ছিল তখন মিহিরবাবু হঠাৎ কাঁদতে শুরু করলেন। সে কি কান্না!! কিছুতেই থামেন না। তার মতো মানুষ —-। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, কথা দে পুজায় একদিন আসবি। কথা দিয়েছিল তাপস। সবাইকে তুই করে ডাকতেন মিহিরবাবু। কথায় কথায় “দূর” “দূর” করে বিরক্তি প্রকাশ করতেও ভুলতেন না। সেই মানুষটির চোখে এমন যন্ত্রণার জলছাপ, সত্যি অবাক হয়ে গিয়েছিল তাপস।
নবমীর সকালে বাস থেকে নতুন বউ নিয়ে নামল ও। আগের দিন রাতে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হয়েছে এখানে। রাস্তা ঘাট প্রায় ফাঁকা। হাতে গোনা যে দু- চারটে মন্ডপ ছিল সব জৌলুস বিহীন। শহরে যে পঞ্চাশেক দোকান ছিল সেগুলো বন্ধ। নবমীর দিন বলেই হয়তো দোকানপাট বন্ধ। এসব ভাবতে ভাবতে মিহির বাবুর বাড়িতে এসে পৌছল সে। বাড়ির সামনে তখন লোকে লোকারণ্য। শহরের সমস্ত সমাগম যেন বয়ে এসে এখানে জমা হয়েছে। ভেজা ভেজা পরিবেশ ভাঙা ডালপালা এমনকি গাছও। আগের দিন রাতে ভয়ানক বাজ পরে। সেই বাজেই মৃত্যু হয় মিহিরবাবুর।
সেই শহর আর আজকের শহরে কোন মিল নেই। সেই স্কুলও জৌলুস হারাতে হারাতে প্রায় বন্ধ। কোন দুর্যোগই আজ উৎসবের দাপট ভাঙতে পারে না। এত আলো এত হই হট্টগোলে নিশ্চয় রয়েছে মিহিরবাবুর অগুনতি প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রীরা। তারাও কি তাপসের মত বসে বসে ভাবছে! নাকি চপ বিরিয়ানি আর সেল্ফির দাপটে স্মৃতি বিলুপ্ত হয়ে খুঁজে বেরচ্ছে ভার্চুয়াল আনন্দ।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments