বুধবার, ফেব্রুয়ারী 8, 2023
বাড়িকুলিক রোববারকুলিক রোববারে আজকের অণুগল্প 'এতোয়ার এর খুদে জগৎ'। লিখেছেন অনির্বাণ ঘোষ

কুলিক রোববারে আজকের অণুগল্প ‘এতোয়ার এর খুদে জগৎ’। লিখেছেন অনির্বাণ ঘোষ

মার্চ ১৭, ২০১৯ কুলিক রোববার :

এতোয়ারের খুদে জগৎ

অনির্বাণ ঘোষ

ছোট ছোট পায়ে হেঁটে চলেছে এতোয়ার। আলতাপুর স্কুলমাঠের ওপারে ওর বাড়ি। বাড়ি বললে একটু বাড়াবাড়িই হয়। বলা চলে মাটির দেয়াল শণের আচ্ছাদনের আস্তানা। নজর নিবিষ্ট ওর দু’হাতে ধরা কাঠি বরফে। ঐ একটু বরফ আর তার শীতল মিঠাস রঙিন করে রেখেছে ওর মুহূর্তগুলো। বরফ গলে গলে ফোঁটা ফোঁটা জমা হচ্ছে কোণার দিকে। আর সেই ফোঁটা ওর কবজি ধরে কনুইয়ের দিকে এগোবার আগেই চেটে নিচ্ছে সুড়ুৎ করে। মাঝে মাঝে তার সতর্ক নজর এড়িয়ে দু’-একটা ফোঁটা কনুইয়ের দিকে এগোতে থাকলে চেটে নিচ্ছে গোটা হাতটাই। তার পায়ের তলার ঘাসকে দিব্যি রেখে পিছিয়ে পড়ছে রতনের আইসক্রীমের গাড়ি। আর ক্রমশঃ ফিকে হয়ে আসছে আইসক্রীম গাড়ির রিনরিনে টুংটাং । এতোয়ারের অবশ্য এসব কোনদিকেই নজর নেই। গত সাত বছরে রোলার চালিয়েও সমান করতে না পারা প্রাচীরহীন মাঠের অসম তলের সাথে সাথে উঠছে আর নামছে ওর হাতে ধরা আইসক্রীম। আর তার সাথে একই তালে উঠছে আর নামছে পৃথিবীর যাবতীয় স্বাদ শুষে নেওয়া মুহূর্তের ওর ঠোঁট।
এই রোককে! একটুর জন্য পায়ের সামনে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল চিক্ক্বণ কালো ছাগলছানা। ক্যাঁকক্যাঁক করতে করতে বিরক্তিভরে ছানাপোনা আগলে ওর পথ থেকে সরে দাঁড়ালো গোবর খুঁটে দানা খোঁজা লাল ঝুঁটি এক সাদা পেটমোটা মুরগী। মাঝ দুপুরের দাপুটে সূর্যের চোখ জ্বলা আলো আর এতোয়ারের ছোট্ট ছায়ায় খেলা করতে করতে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে লাল আর কালো দুটো কুকুরছানা। ওঠে, পড়ে, গড়ায়। আবার ছোটে ছায়া ধরার খেলায় মেতে। এতোয়ারের মতোই বেখেয়াল ভ্রূক্ষেপহীন। মাঝমাঠে ঘাসের আড়ালে চলা লাল পিঁপড়ের গোপন কুচকাওয়াজ বিশৃঙ্খলিত হয় যখন এতোয়ারের বাঁ পায়ের গোড়ালি আর ডানপায়ের বুড়ো আঙুল পিষে দিয়ে যায় গুটিকয় সাহসী সেনানী। মিষ্টসন্ধানী পিঁপড়েকুলে এই কেওস, কনফিউশান – সবকিছুই অজানা থেকে যায় রসগ্রাহী এতোয়ারের। ও এগিয়ে চলে।
হেই সামালো! পিচের কোণের উইকেট খোঁড়া গর্তে পা পড়ে হোঁচট খেলো এতোয়ার। ডানহাতে কাঠিধরা চুষতে থাকা বরফ পড়তে পড়তেও পড়ল না। এতোয়ার ব্যালান্স করে সামলালো নিজেকে ও কাঠি বরফটিকে। হিমশীতল বরফ টুকরোটি একটিবার কমলা ঝলকানি দিয়েই থিতু হল যথাস্থানে। ওর এই হোঁচট খাওয়া ও এক মুহূর্তের জন্য থেমে যাওয়াতে দু-এক কদম এগিয়ে গেলো কুকুরছানারা। পেছন ফিরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে গেল লালছানাটি। আর কালোটি আধবসা হয়ে পেছনের ডান পা দিয়ে জমিয়ে চুলকে নিল অর সাদা রিবনওয়ালা ঘাড় ও গলা। এতোয়ার তার চলা বন্ধ করে কাঠি ধরে ঝুলিয়ে দিল ওর কমলা বরফ। আর বরফের মসৃণ গা বেয়ে নেমে এলো কমলা ফোঁটারা – টপ্ টপ্ করে। পর্যায়ক্রমে কালো ও লাল ছানার মুখে। ছোট ছোট গোলাপী জিভ বের করে চেটেপুটে নিচ্ছে ছানারা। এই হঠাৎ রসবর্ষায় হ্লাদিত হয়ে হুটোপুটি শুরু করে দেয় ছানারা। বরফের গলন সচকিত করে গেল এতোয়ারকে। ক্রমশঃ ক্ষীয়মান বরফের সবটুকু মুখে পুরে সড়াৎ করে চুষে নেয় যতটা পারে। মনের অলিন্দে কুলকুল বয়ে চলে হারিয়ে যাওয়া কতশত সরস্বতীরা। আবার স্বকীয়চালে এক্কাদোক্কার ছন্দে হাঁটতে থাকে এতোয়ার। হুটোপুটি লুটোপুটি করতে করতে পিছু নেয় কুকুরশাবকেরা। লম্বা লম্বা কয়েকটানে বরফের রঙ ও রস কিছুটা নিঃশেষিত হয়ে কোথাও কোথাও রূপের অভাব ঘটে। এককোণে বর্ণহীন বরফ আরপার দেখা যায়। ছোট ছোট ইদুঁরদাঁতে কুটকুট কেটে পেটে চালান করে। পৌষ্টিকনালি বেয়ে যা এগোয় তা কি শুধুই নিখাদ তরল?
আর ক’পা এগোলেই তার মাটির বাড়ি। নিকানো দাওয়া শণের চাল। সিঁদুর রাঙা শিমূলছায়া মেখে দাঁড়িয়ে আছে। বরফের আর সিকিভাগ অবশিষ্ট। তার থেকে একটা টুকরো ছোট্ট কামড়ে ভেঙে নেয় এতোয়ার। মুখ থেকে ফেলে ঘাসে ঢাকা মাটিতে। হুটোপুটি করে চেটে খায় কুকুরছানারা। পরম আগ্রহে চোখ মেলে দেখে সে। তারপর বাকি বরফটা কামড়ে মুখের মধ্যে। জিভ আর টাকরার চাপে নরম হয়ে কঠিন বরফ তরল হয়ে আসে। চাঁদিফাটা রোদ্দুরে এই হিমশীতলতা এক মহুয়া আবেশ ছড়ায়। ঝোলাবন্দী ছেঁড়াফাটা সরকারী বইয়ের দল হেসে ওঠে খিলখিল। সমস্ত হানাহানি, কাটাকাটি, কালাধন, নোটবন্দি, সীমান্তসংঘর্ষ, গোলাবারি বরফের কাঠির মত পিছে ছুঁড়ে ফেলে তার ঘরের নিশ্চিত আঁধারে ঢুকে পড়ে এতোয়ার।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments