কুলিক রোববার: গল্প: হাতবাক্স

সাধন দাস

 ঘুম ভেঙে দুই বুকে একটু একটু ব্যথা খুঁজে পেলাম।। বোঁটা দু’টো সামান্য ফুলেছে। সাথে একটু লজ্জা। কাউকে বলতে পারিনি। পেঁচিকে দেখেছিলাম, বুক টিপে রস বের করে ষাঁড়াগাছের আঠা লাগাতে। বলেছিলো- ব্যথা বসে যায়, বুক উঠে আসে।        

চিলেকোঠার ঘরে বুকে আঠা লাগানোর পর  শিরশিরানির সময় ভাঙা মিটসেফের ভিতর আবিস্কার করলাম কাঠের একটা হাতবাক্স। সারা গায়ে সুক্ষ জটিল লতাপাতা আঁকা, শুকিয়ে যাওয়া রক্তের মতো রঙ, তালা বন্ধ। 

মাকে জিজ্ঞেস করলাম- মা, বাক্সটাতে কী আছে? 

মা ঠাস করে চড় কষিয়ে বলেছিলো।– বেহায়া মেয়ে, অতো খোঁজে দরকার কী?  

বুক ভার হয়ে গেলো। সেই এক ঝলক দেখেছিলাম। তারপর বাক্সটা উধাও হয়ে গেলো। নিশ্চয় মায়ের ছিলো, লুকিয়ে ফেলেছে। আগাথা ক্রিষ্টির গোয়েন্দা মিস মার্পল হয়ে  বাক্সটা খোঁজা শুরু করলাম। যতো না পাই, বুকের ভার বেড়ে যায়। ভাবি, জটিল লতাপাতার সুক্ষ কারুকাজের বীজ বুঝি বাক্সের ভিতরে আছে। 

বাবা বদমেজাজি জাহাজি মানুষ। ন’মাস ছ’মাসে বাড়ি আসেন। কখনও গ্রীস, কখনও ইতালি, কখনও ভেনিস থেকে কড়া গোঁফের মতো কটা ধূসর রঙের চিঠি পাঠাতেন। চিঠির অক্ষরে অক্ষরে আমাকে, এমন কি মাকেও বকতেন, শাসন করতেন, আর নির্দেশ দিতেন। আমরা দু’জন ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতাম, কখন বাবার চিঠি আসে। একদিন দেখে ফেললাম, ধূসর খামে নীল রঙের আর একটা খাম। মা সেটি তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেললো ব্লাউজের ভিতর। মিস মার্পল হয়ে সারাদিন পিছু ঘুরেও চিঠিখানা বের করতে দেখিনি। ভাবলাম, নীল চিঠিগুলো মায়ের বুকে মিশে যায় নচেৎ ফাঁক বুঝে  লতাপাতার বাক্সে ঢুকে পড়ে।  

বাবা জাহাজে সাইন অন করার আগে ভয়েজের দিন গুনে সাদা খাম আর নীল পাতার প্যাড কিনে দিতেন মাকে। আমি ঘুমিয়ে পড়লে মা প্রতিরাতে চিঠি লিখতো। মিস মার্পল হওয়ার পর দেখেছি, চিঠি নয় মা নীল প্যাডে কবিতা লিখতো। কিন্তু কোনোদিন চিঠি পোষ্ট করতে দেখিনি। আন্দাজ করেছি, নীল চিঠি আর নীল কবিতা ওই হাতবাক্সে থাকে।

বাক্সটা খুঁজে পাইনি। হেরে যাওয়া মিস মার্পলের অসহ্য ছিলো। আমিতো আসল মিসমার্পল ছিলাম না। সেজন্যে মায়ের চেয়ে বড়ো, আরো সুক্ষ ডিজাইন তোলা একই রকম বাক্স কিনে জেতার তৃপ্তি পেতে চেয়েছিলাম।

মায়ের হাতবাক্স নিয়ে পেড়াপিড়ি আমি একা না; বাবাও করতেন। বাক্সের অধিকার হারানোর ভয়ে মা একদিন কড়িকাঠে ঝুলে পড়লো। 

না চাইতেই মা যেদিন আমাকে হাতবাক্স দিয়ে দিলেন তার আগে  ঘুনাক্ষরেও কড়িকাঠের ব্যবহার বুঝিনি।   

মায়ের বাক্সটা তখনকার মতো আমার বাক্সে লুকিয়ে রেখেছিলাম। 

বাবা আর প্রেমিককে লুকিয়ে একদিন আমার বাক্স খুলে দেখি মায়ের বাক্সের মধ্যে আর একটা বাক্স। মা জানিয়ে ছিলেন, সেটি দিদিমার। সেটি খুলে দেখি তার মধ্যে আর একটি, তার ভিতরে আর একটি —- ।

Leave a Reply