সোমবার, জানুয়ারী 30, 2023
বাড়িস্বাস্থ্যসুস্থ থাকুন : শিশুর সাতকাহন

সুস্থ থাকুন : শিশুর সাতকাহন

ডাঃ নীলাঞ্জন মুখার্জি

আগস্ট, ৮,২০২০: চার মাস কেটে গেলো দেশের লকডাউন। মাঝে কিছুদিন আনলক পর্বে একটু গাছাড়া মনোভাবের কারণেই হয়তো আবার জাঁকিয়ে বসছে করোনা র প্রকোপ। আজো জনগণের এক বৃহদংশ উদাসীন এবং এর অন্তিম পরিণতি কি তা বোধহয় আমরা অনুধাবন করতেও পারিনা।

এমতাবস্থায় আমরা সবাই ঘরবন্দি দিন কাটাচ্ছি, এবং মজার কথা ছোট্ট থেকে যা আমরা দেখে ও শিখে আসছি যে ‘মানুষ সমাজবদ্ধ জীব’, ‘সকলের সাথে মিলেমিশে চলতে বা থাকতে হয়’, আজ তারই বিপরীত ধর্ম পালনে আমরা সদাতৎপর।

কিন্তু ভারী মুশকিল হয়েছে আমাদের খুদে ও কচিকাঁচাদের। প্রথমেই বলি বাড়িতে তারা যে পরিবর্তনগুলোর রোজ সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলো নিয়ে। যেমন — স্কুল বন্ধ ফলে দিনের একটা বড় সময় বাড়িতে থাকতে হয়। শুধু তাই ই নয় পাশের বাড়ি বা ফ্ল্যাটে (এমনকি বস্তি, ঝুপরিতেও) যাওয়া প্রায় নিষেধ , ফলে অসহায়, ঘরবন্দি।

বাইরে কর্মরত বাবা/ মা কিংবা দুজনেই সারাদিন ঘরে। ফলে দৈনন্দিন রুটিনে ব্যাঘাত। নিজের মতো করে যতটা মা/ ঠাকুমা কে পাওয়া যেত তা আর হচ্ছে না।

বড়রা সময় কাটাতে টিভি সিরিয়াল, হোয়াটস আপ, ফেসবুক,ফোনে বাক্যালাপ বা নেটফ্লিক্স এ বুঁদ হয়ে রয়েছে।তাহলে শিশু বেচারা করে কি ? তাইতো সেও নিশ্চিন্ত আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছে টিভি অথবা মোবাইলে।

এবার আসি শিশুদের স্বভাব পরিবর্তন বা Behavioral Change এর কথায়:-

যেমন 1–5 বছর পর্যন্ত toddler দের সমস্যা একরকম।অতিমাত্রায় জেদ, খাবারে অরুচি, বায়না করা, অতিরিক্ত চঞ্চলতা বা অন্য শিশুদের সাথে মারামারি করা। এর থেকে বড় বাচ্চাদের সমস্যা আবার অন্যরকম হয়। 6— 12 বছর অবধি বাচ্চাদের প্রধান প্রবণতা থাকে বড়দের লুকিয়ে এমন কাজ করা যা মোটেই অনুমোদনযোগ্য নয়। তার কারণ তারা বুঝতে শেখে যে এটা করা মোটেই উচিত বা ভালো নয়।

কিন্তু ছোটদের সেসব বালাই নেই। তারা সর্বদাই এমন কিছু করতে চায় যাতে বড়দের মনোযোগ আকর্ষিত হয়।এদের বলে attention seeker। এই শিশুদের প্রতিপালনে সাহায্য হতে পারে এমন কিছু টিপস দিতে চাই নতুন বাবা মায়েদের জন্য।

1) সবার প্রথমে “না” বলা বন্ধ করুন। বাড়িতে 3/4 বছরের একটি busy body থাকলে সর্বদা শশব্যস্ত করে রাখে আমাদের। ওদের অধিকাংশ কাজেই আমাদের বাধা দেবার অভ্যাস। ধরুন টেবিলের ওপর সাজানো বইপত্র গুলো ও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে ফেলে ছত্রাখান করে দিলো। ওকে না বকাঝকা করে সেই বই থেকেই একটা ছবি বের করে ওকে গল্প করতে পারেন বা বইগুলো দিয়ে কোনো পশু বা ফুলের অবয়ব তৈরি করে ওকে তাক লাগিয়ে দিন।

2) 2–3 বছরের মধ্যে শিশুর জেদ একটু আধটু হতেই পারে। একে Temper Tantrum বলে। বয়স বৃদ্ধির সাথে তা আপনি ই চলে যায়। কিন্তু অনেক সময়ই তা মাত্রাতিরিক্ত হয়। এক্ষেত্রে প্রথমেই বলি শিশুর ওপর জোর না খাটিয়ে নিজেদের একটা নোটবুক তৈরি করুন,যাতে নথিবদ্ধ করুন সকাল থেকে সারাদিনে কতবার আপনি ওকে নির্দেশ দিয়েছেন বা বাধা দিয়েছেন। একে আমরা বলি instruction counting notebook। গুনে দেখুন গড়পড়তা 200 বা 250 বার করে ফেলেছেন। চেষ্টা করুন প্রথম মাসের শেষে এটা 100 তে নামিয়ে আনতে।লক্ষ্য রাখুন যাতে 6 মাসের মধ্যে ওটা 50 বারে নেমে আসে। আশ্চর্যজনক ভাবে খেয়াল করবেন আপনার বাড়ির শিশুটি ও শান্ত হতে শুরু করেছে।

3) মনে রাখবেন আমাদের বড়দের ও যেমন নিজস্ব পেশা বা নেশা আছে, এই খুদেদের ও কিন্তু একটাই occupation, তাহলো খেলা।তাই শিশুকে জোর করে অক্ষর চেনানো,অঙ্ক শেখানো না করে খেলার মাধ্যমে তা করুন। খেলনা নিয়ে ওর সামনে ধরে ওকে বাছতে দিন। দিনের প্রত্যেকটা ঘরোয়া কাজেও ওকে সাথে নিন,সেটা রান্নাঘরের কাজ থেকে পুজো / আরাধনা যাই হোক না কেন। দেখবেন ও ধীরে ধীরে আপনার অনুকরণ করছে।আপনি টিভি বা মোবাইল কম দেখে বই পড়লে সেও আপনার মতোই বইমুখী হয়ে উঠবে।

4) পরিশেষে বলি, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দুটি জিনিস হলো ফুল ফুটে ওঠা আর শিশুর মুখের হাসি। একজন শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি সর্বদা সেই সুখ অনুভব করি তা অনবদ্য। সর্বমঙ্গলময়কে অকুন্ঠ ধন্যবাদ যে কেউ সৌভাগ্য আমি পেয়েছি।

একটা ছোট্ট ঘটনার উদাহরণ দেই। দুদিন আগে মা বাবার কোলে চেপে এক/ দেড় বছরের এক শিশু আমার কাছে এসেছিলো তার টিকাকরণের জন্য। আমি যখন ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ফোটালাম তার শরীরে,তখন আমার দিকে তাকিয়ে তার তীব্র অভিমান ভরা আকুতি আমায় রীতিমত বিদ্ধ করছিলো। কিন্তু আবার খানিক পরেই বাবার কোলে চড়ে যখন সে চেম্বার ছেড়ে বেরোচ্ছে তখন হাত নেড়ে আমাকে টা টা করতেও সে ভোলেনি। তার বিগত 9 মাসের অভিজ্ঞতায় এটুকু সে শিখেছে।

তাই বলছি, একদিকে আমরা যেমন খুব তাড়াতাড়ি এই অতিমারীর প্রকোপ থেকে বেরিয়ে আবার আগের মতো সুস্থ স্বভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরতে চাইছি মনেপ্রাণে,তেমনি একটা সতেজ সুন্দর ভবিষ্যৎ সমাজ গড়তে আসুন না সকলে মিলে আমাদের বাড়ির শিশুদের একটু সময় দেই, পরিচর্যা করি,ওদের সাথে একটু খেলি ?


শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ
রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments