কুলিক রোববার: স্মৃতি ৭৩

সাধন দাস

বাপের নাম খগেন

৪৩ ডিগ্রী তাতের দুপুর। নাগরিকেরা ঘেমেনেয়ে হেদিয়ে ভোটের লাইনে। ভোট গমগমিয়ে চলছে। ১০০ গজ দূরে, বটতলায়, ডোমকল থেকে খুনের খবর এসেছে, আলোচনা  তুঙ্গে। যেনো খুন এই বুথে, এইমাত্র হয়েছে। অথচ কারো হেলদোল নেই। পাশেই আইসক্রীমের দোকান। জমাট ভীড়। লাইন ফাইন নেই। মাৎস ন্যায়। যে পারে সে আগে নিচ্ছে। পারলে পয়সা না দিয়েও নিচ্ছে। আইস্ক্রিমওলার বেঞ্চে পুলিশ ঢুলে ঢুলে এ ওর গায়ে পড়ছে। চাঁদিফাটা রোদ্দুরে দু ঘন্টা দাঁড়িয়ে ভোট দিয়ে বেরিয়েছি। আইসক্রীমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েই আছি। 

মনে পড়লো, টাটকা জেল খালাস কয়েদি আজিজুল হক (নকশাল নেতা) সেদিন রৌরবের (আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকার দপ্তরে) আড্ডায়। আড্ডা তুঙ্গে। 

– ভোট না ভাট! ক অক্ষর পা চাটার দেশে দাসত্বই ফিট। সব শালা জুতোয় সোজা। 

-তোর বাপের নয় শ”য় শ”য় জুতো আছে … আমার বাপেরতো ছেঁড়া গেঞ্জিও নেই রে।

-খোলা পিঠ তো আছে। পেতে দিবি! 

– ভোট দিতে দিতে হয়রাণ তোর বাপেরই তো ভোট দেওয়ার চুলকুনি বেশি।! 

আড্ডার বহরে আজিজুল মিটিমিটি হাসছিলেন। 

হঠাৎ বলতে শুরু করলেন, আমরা তখন জেলে। হিরো হিরো স্কলার সব ছেলে। গোল হয়ে বসে গুলতানি মারি। রুলের গুঁতো খেয়ে একখানা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী মাল গোবিন্দ, ঠাসি হয়ে গেছে। পাছার ব্যথায় চিৎ হতে পারছে না। শুয়ে শুয়ে আবিষ্কার করেছে, গণতন্ত্রই নাকি সভ্যতার চাবিকাঠি। ভোটই শেষ কথা। 

আড্ডা বসেছে শোয়া গোবিন্দকে ঘিরে। গোবিন্দর বাবার নাম অকূল। সাধাসিধে মানুষ। চুরি, ছ্যাঁচড়ামি করেন না। ছেলের দায়ে ঘুষ দিয়ে সপ্তাহের বিড়িটা জেলে সাপ্লাই দিয়ে যান। সে সপ্তাহে তিনি আসেননি। 

আড্ডায় পেছন গরম করা হলো গোবিন্দর। 

-খগেন তো এ সপ্তাহে এলো না রে!

-কিরে, খগেন এলো না কেনো? বিড়ি দেওয়ার ভয়ে?

ঠাসি হয়ে ছিলো গোবিন্দ। একজন গায়ে খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলো -কিরে খগেনের বিড়ির পয়সাটাও জুটছে না, নাকি? 

এতক্ষণে গোবিন্দ খেপে ফায়ার। 

-শ্লা, হারামির দল, আমার বাবার নাম অকূল।

-ওর্‌রে না, তোর বাপের নাম খগেন।

-না। অকূল।

– বেশ তাহলে ভোট হোক। 

ভোটারের প্রিসাইডিং আজিজুলদা। হাঁকলেন, গোবিন্দর বাপের নাম অকূল। 

গোবিন্দ ছাড়া কেউ হাত তুললো না। তুলবে কি, সব তো চোখে চোখে কানকি মেরে গটআপ হয়ে গেছে। 

আজিজুলদা ফের হাঁকলেন, গোবিন্দর বাপের নাম, খগেন।  

দশজন ভোট দিলো “খগেন” নামের পক্ষে। 

আজিজুলদা বলে উঠলেন- গণতন্ত্রের রায়ে তোর বাপের নাম খগেন, প্রমাণ হয়ে গেলো।

গোবিন্দ পাছার ব্যথা ভুলে উঠে বসে পড়েছে। জেল মাথায় করে চেঁচিয়ে উঠলো – না আআআআ …  

আজিজুলদা মিটিমিটি হেসে বলেছিলেন- দশচক্রে গণতন্ত্র ভূত। তোর বাপকে তো শুধু খগেন করেছি মাত্র। অনেক কিছু করা যায়। কালে কালে দেখতে পাবি।  

সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। রৌরবের ম্যাড়া চাঁদু গম্ভীর বুঝদারের মতো ফতোয়া দিলো – গণতন্ত্রে এখনো ভোট হয়, সেই আনন্দে এক পাক চা হয়ে যাক। 

তখনও ভীড়ের ঝঞ্ঝাটে আইস্ক্রীমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। করুণ স্বরে চেঁচাচ্ছি – লাইন দাও লাইন দাও। 

কারা ভীড়ের মধ্যে খিক খিকিয়ে হাসছে।  

17