কুলিক রোববার কবিতা : ভুলে যাওয়া বৃষ্টিগান
(একটি ব‍্যক্তিগত গদ‍্য)

সন্দীপ কুমার ঝা

কোনও কোনও বর্ষা বিকেল, তখন ঘন অন্ধকারে ডুবে যেত।খড়ের ছাউনি আর মাটির দেওয়াল।ঘরের ভেতরে বাইরে অন্ধকারের তফাৎ সামান‍্যই। পুরোনো কাঠের টেবিল।বসে বসে লণ্ঠনও সেদিন ঘুমিয়ে পড়তে চাইত।বাইরে একটানা ঝম্ ঝম্ বৃষ্টি । ঝিঁঝি আর ব‍্যাঙের ডাকে,ডুবন্ত দ্বীপের মত ছিল আমাদের বাড়ি।    আমাদের গ্ৰাম।

সান্ধ‍্য পাঠের আয়োজনে পেতে রাখা মাদুর,দরজা ও উঠোনের সরল রেখায়।সেই সন্ধ্যায় বাবর,আকবর খাবি খেত উঠোনের জলে।রান্নার জন্য খুপড়িতে মায়ের টুংটাং ভেসে  আসত। ভিজে একসা বাবা ছপছপ করে ,উঠে আসত কাদা-মাটির দাওয়ায়।

সেইসব সন্ধ্যায় বৃষ্টির সাথে,তখন একটা অদৃশ্য প্রার্থনাও নেমে  আসত।নিশ্চুপে চাইতাম-মাষ্টার মশায়ের সেই চেনা ছাতাটা,আজ কোনও কারনেই যেন,গলিটার মুখে না  দাঁড়ায়!

সেই  সব রাতে আমার সঙ্গে ঘুমাত স‍্যাঁতস‍্যাতে বিছানা,স‍্যাঁতস‍্যাঁতে বালিশ।শুধু আমি  জাগতাম।

গভীর রাত।ঘরের জানালা ছুঁয়ে পানাপুকুর।কাছের বনজাম,করমচার জঙ্গলের উপর ঝুলত,
কলাইকরা থালার মত সাদা, বৃষ্টি পরবর্তী চাঁদ।
ব্রহ্মদৈত‍্যি থেকে বকাসুর,সবাই সেখানে থাকত।শুধু দুজন বাদ। সময় আর মাষ্টারমশাই।তাদের লাল চোখ।

বৃষ্টিরা বোধহয় মাঝরাতে বাড়ে।তখন বাতাসের সাথে,পাল্লা  দিয়ে বাড়ত মায়ের ভয়। ঘরজুড়ে জলের ফোঁটা-  টপ্ !  – টপ্  ! –  টপ্ ! ঘরময় পেতে রাখা বাটি গ্লাস!জলকে ধরতে,দারিদ্র‍্যের পক্ষ থেকে পাতা,অব‍্যর্থ ফাঁদ!

রাতভর টিনের বাসনে,বেজে চলা জলতরঙ্গ!
টিপ্ –  টিপ্ –  টিপ্!

এখন শুধুই টিক্-টিক্ -টিক্! ঘড়ি গিলেছে এখন  সমস্ত জলশব্দ।মসৃণ দেওয়ালে ঝুলছে চকচকে ঘড়ি।

আজ ঘরে শুধু দুজন থাকি।আমি আর সময়।
এখন এখানে,সে বৃষ্টির প্রবেশ নিষেধ।

30