কুলিক রোববার: স্মৃতি ৭২

সাধন দাস

স্মরণঃ নানুদা 

মুর্শিদাবাদের কবি নারায়ণ ঘোষ। আমাদের নানুদা। মারা গেলেন ২৪ জানুয়ারী ২০১৭। ৬০-৮০র দশকে উল্লেখযোগ্য কবি, প্রাবন্ধিক। তথ্য সমৃদ্ধ, যুক্তিনিষ্ঠ, নির্ভরযোগ্য, শিক্ষকমন্য, আশ্রয়, আমাদের অভিভাবক। স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ১৯/২/১৭ তারিখে তাঁর স্মরণ অনুষ্ঠান হলো। 

বাড়ি থেকে কিংবা রক্তের সম্পর্কে কেউই অনুষ্ঠানে আসেননি।

সাকুল্যে ৩৫/ ৩৬ জন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। যাঁরা মঞ্চআলোক তাঁরাই অন্তত ত্রিশজন মান্য বক্তা, আবৃত্তিকার, গায়ক। শব্দ কোনো প্রমান রেখে শ্রুতি হয় না। মাইকের উচ্চারণে যার যা কর্তব্য এবং প্রচার শেষ হচ্ছিলো, চলে যাচ্ছিলেন। বাকি বক্তারা অপেক্ষা করছিলেন কখন তিনি প্রচারিত হতে পারবেন এবং আপন প্রচার শেষে অন্তর্হিত হতে পারবেন।  

শেষ জীবনে কেনো জানি না,  নানুদা অসামাজিক হয়ে গেছিলেন। কারো সাথে দেখা করতেন না। ফোন করলে রিং হয়ে যেতো। এমন কি বৌদিও ধরতেন না। কী জানি, কোনো অভিমানে কিংবা হয়তো কোনো আঘাতে গুটিয়ে যাচ্ছিলেন। দুঃখ, কষ্ট খুব লুকিয়ে রাখতে জানতেন। 

খাগড়ায় হিদুদার চায়ের দোকানের পেছনে ছোট্ট একটা ঘরে আমরা আড্ডা মারতাম। মদ, গ্যাঁজা, বিড়ি, কবিতা, গদ্য, ছবি গ্রহণে বর্জনে নেশায় গমগম করতাম।  নাম ছিলো আবাহমান ১২৩। নানুদা আসলেই আমরা ভালো ছেলে হয়ে যেতাম। নানুদা নেশা পছন্দ করতেন না। আমরা করি, এ জন্য কষ্ট পেতেন। মুখে বারণ করতেন না। 

ভারিক্কি চেহারার মানুষটাকে এখানেই প্রথম দেখি। এক প্রাচীন সাইকেল আরোহী। কাঁধে ঝোলা। অভিভাবকের মতো সোজা হয়ে বসতেন। স্পষ্ট ভাষায় ধীরে কথা বলতেন। আমরা শুনি বা না শুনি, মান্য করার মতো কথা। আমাদের উশখৃঙ্খল যাপনের মাঝে চাইতাম নানুদা আসুক। আমরা আর একটু ভালো হই, আরো একটু ভালো লিখতে শিখি, ভালো ভালো কাজ করি। নানুদা আসতেন। দরকারে অদরকারে, মিটিংয়ে, পত্রিকা প্রকাশে, যখন ইচ্ছা হতো। পরীক্ষা মূলক কবিতা লিখতেন। ভারী, সৃষ্টিশীল প্রবন্ধ লিখতেন প্রথমা সেন নামে। আমাদের পত্রিকা রৌরবের মান বেড়ে যেতো। আমার ট্রান্সফারের চাকরি। একসময় বহরমপুর ছাড়লাম। 

ঘুরেফিরে বহু বছর পর বহরমপুর ফিরেছি। অফিসে হঠাৎ একদিন নানুদা হাজির। কিছু কাজ ছিলো। মিটিয়ে দিলাম। শুরু হলো গল্প। নানুদা আর আড্ডায় আসেন না।  দেখাও বড়ো একটা হয় না। আজকাল নাকি কারো সাথে বিশেষ কথাও বলেন না। সব মিথ্যে করে দিয়ে সেদিন অনর্গল গল্প করছিলেন। শেষই হয় না। এক সময় বুঝলেন, আমার কাজের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আসি বলে চলে যেতে গিয়ে ফিরে দাঁড়ালেন। বললেন, দাব্বুকে কুঁজো করে দিলে?

সেদিন রাতেই আবার ফোন। তখন রাত ন’টা। এককালে ‘মেকানাইজেশান’ ‘গ্লোবালাইজেশান’ ‘খোলা হাওয়া’ নামে পর পর তিনটে গল্প লেখার চেষ্টা করেছিলাম। ছাপাও হয়েছিলো। নানুদা সেই গল্পের আলোচনা করছিলেন। ‘মেকানাইজেশান’ গল্পের একটি চরিত্র ‘দাব্বু’। ছ’ ফুটের কাছে লম্বা মানুষ। ট্রেড ইউনিয়নের নেতা। ঘরে দোরে চলতে ফিরতে চৌকাঠে ঠোক্কর খেতেন। রাষ্ট্রের চাপে মানুষটা সংসারে, সমাজে, হেরে যাচ্ছিলেন। লজ্জিত, অপমানিত হচ্ছিলেন। হতে হতে কুঁজো হয়ে যাচ্ছিলেন। গল্পের শেষ দিকে মাথা একেবারেই উঁচু রাখতে পারেননি। দরোজার চৌকাঠে আর ঠোক্কর খেতেন না। নিচু হয়েই গিয়েছিলেন। 

নানুদা টেলিফোনেও অভিযোগের সুরে বললেন- সাধন, দাব্বুকে কুঁজো করে দিলে! 

গল্প করতে করতে রাত বেড়েই চলছিলো। গল্পের মাঝে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে হঠাৎ হঠাৎ বলে উঠছিলেন- সাধন, দাব্বুকে কুঁজো করেই দিলে?

ফোন কেটে দেওয়ার আগেও একবার বললেন।

কুঁজো করে দেওয়ার অপরাধ যেনো আমারই। লজ্জায় চুপ করে ছিলাম।

শেষ দিকে নানুদাকে দেখেছিলো তাপস ( সরখেল, কবি )। স্মরণ অনুষ্ঠানের শেষে বললো- তোমরাতো দেখোনি। মরার আগে সাড়ে পাঁচ ফুট মানুষটা গুটিয়ে সাড়ে চার ফুট হয়ে গেছিলেন। 

19