কুলিক রোববার: স্মৃতি:৭১

সাধন দাস

শহরে বাশারদা ২ 

বহরমপুর বাশারদার নিজের শহর। সাহানাকে নিয়ে এসে উঠেছে মডার্ন হোটেলে। রূপা, আমি গিয়েছিলাম সুখ দুঃখের গল্প করতে। ভুলেই গেছিলাম, বাশারদা এখন সেলেব। ডাবলবেডের একটা রুম ভীড়ে ঠাসা। বিদগ্ধ পণ্ডিত, সাহিত্যিক, জব্বর সাংস্কৃতিকদের সেক্যুলারিটি বিষয়ে গুরু গম্ভীর আলোচনা চলছে। অনেক উত্তেজনা গড়িয়ে যাওয়ার পর বাশারদার সাথে চোখোচোখি হলো হাসিতে। সেই আব্দুল মাঝি মার্কা সূচালো  দাড়ি। বিছানার মাঝখানে সেই মোড়লী ঢঙয়ে বসে আলোচনায় হাল ধরে আছে। আগের মতোই তর্জনী তুলে হাত ঘুরিয়ে অনর্গল কথা বলে চলেছে। মোল্লাতন্ত্রের বিরূদ্ধে বোমা ফাটাচ্ছে। কিন্তু সুক্ষ্ম কানে ধরা পড়লো, ধর্মের বিপক্ষে কিছু বলছে না। পিছনে পড়ে থাকা মোল্লাতন্ত্রকে বকাঝকা করে ধর্মের পক্ষে কৌশলী প্রচারে মেতেছে।   

বাশারদা খুব ভালো করেই জানে, কোনো ধর্মই এখন আর কোনো সমাধান নয়, বরং সমস্যা তৈরি করছে। বিচ্ছিন্নতা, পরস্পর বিরোধীতা, হিংসা তৈরি করছে। মানুষদের অসৎ হতে ইন্ধন জোগাচ্ছে। ধর্মে আশ্রিত সৎ মানুষদের হাতের পুতুল তৈরি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। ধর্মকে পুঁজিপতিরা পুঁজি বানিয়ে ফেলেছে, ব্যবসায়ীরা লাভে খাটাচ্ছে, রাজনীতিকরা ভোট বানাচ্ছে, সংস্কৃতির চর্চায় ধার্মিকেরা অন্যধর্মে আধিপত্য বিস্তারের অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে। যত মন্দির মসজিদ চার্চ ভাঙছে তার চেয়ে বেশি বানাচ্ছে।  

বেশিদিনের কথা নয়, এসব আলোচনা দিনের পর দিন রৌরবের আড্ডায় হয়েছে। বাশারদা আড্ডার মাঝখানে থাকতো। আমাদের বিন্দুমাত্র ভুল যুক্তিকে নস্যাৎ করতে উদ্যত বক্তা ছিলো। সেই বাশারদা নজরুলের গানের ছন্দ আবিষ্কার করছে উটের চলনের মধ্যে। ব্যাখ্যা করছে উট মরুভূমি তথা মুসলিম অধ্যুষিত দেশের প্রাণী। মুসলিম সংস্কৃতি সম্পৃক্ত এই ছন্দ। নিজেই গেয়ে দুলকি চাল বুঝিয়ে দিলো, মোমের পুতুল মমির দেশের মেয়ে  …, লাল টুকটুকে বৌ যায় গো লালা নটের ক্ষেতে যে লাল নটের ক্ষেতে  …,  দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি  …  আচমকা ছন্দের এই অদ্ভুত আবিষ্কারে আমিও মজা পেয়ে গেলাম। মনে হলো, বাশারদা যা বলছে ঠিক, কিন্তু যখন কান বেড় দিয়ে নাক দেখানোর মতো এই যুক্তিতে প্রমাণ করতে চাইলেন, নজরুল যাই লিখুন, মূলত তিনি মুসলিম। তাঁর অন্তরাত্মায় ইসলামের বাস। আমার আত্মা বিদ্রোহ করে উঠলো, এ কোন সত্য! 

তাহলে কোন বাশারদার কাছে জেনেছিলাম- অস্বীকার করার উপায় নেই নজরুল মুসলিম,কিন্তু জন্মসূত্রে বাধ্য হয়ে। ধর্ম তাঁকে জন্ম দেয়নি। জন্মসূত্রের সত্যকে পিছনে ফেলে কর্মের সত্যে তিনি নতুন জন্ম নিয়েছেন। নিজেকে প্রস্ফুটিত করেছেন মানবতার ধর্মে, অন্যায় অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে জেহাদি, মানুষের স্বাধীনতার প্রবক্তা। 

সামনে বসা বাশারদার কথা শুনতে কষ্ট হচ্ছিলো। আমরা অভিনয় করতে শিখে গেছি। কষ্ট চেপে হাসি মুখে সাহানা (বাশারদার বৌ) রূপা আমি খানিক গল্প করলাম। বুঝলাম, বাশারদার ফ্যামিলি এখন সেলেব ফ্যামিলি। আসবে না জানি, তবু বাড়িতে আসার নেমন্তন্ন করে ফিরে এলাম।  পা ভারী লাগছিলো। পথ ভর্তি আলো। তবু মনে হচ্ছিলো, পথ হারিয়ে ফেলবো না তো! 

16