কুলিক রোববার গল্প : ছাই

সাধন দাস

আতিকুরদাদের মুরগিটা নকুলদের ঠাকুরঘরে ঢুকে ডিম পেড়ে ফেলেছে। সন্ধ্যেবেলা ডিমটা ফেরত দিতে গিয়েছিলো নকুলের দিদি। অন্ধকারে নাকি কে দেখেছে, আতিকুর নকুলের দিদির গায়ে হাত তুলেছে। 

নকুলের দিদি বলছে- মিথ্যে কথা, আতিকুরদা আমার দাদা। মুরগিটা বদমায়েস।   

কে শোনে কার কথা! দিল্লি মুম্বাই কোলকাতা… রাতারাতি ফোন চালাচালি হলো। তিনাদের কথাই শেষ কথা। রাত পোহালে পুজো, ইদ, উৎসব। তার বদলে লেগে গেলো দাঙ্গা। তে-রাতের মাথায় হিন্দুপাড়া, মুসলমানপাড়া দুইই পুড়ে ছাই। 

আঁচ বুঝে নকুলরা বাঁশবনে সাঁটিয়েছিলো। শেষরাত্তিরে কালো পলিথিন মুড়ি দিয়ে ভ্যানরিক্সায় চেপে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। রাস্তার এদিকে মুসলমান মহল্লা। ওপাড়ে হিন্দুপাড়া। মাঝখানে সবার পায়ের ছাপে তৈরি মাটির পথ। গ্রামপোড়া ছাইয়ে চাপা পড়েছে। চেপে ধরছে চাকা।  পলিথিনের গুহা থেকে নকুল ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে- নেমে ঠেলবো, বাবা? 

চাপা গলায় উত্তর আসে – না, চুপ।

নিজেদের আধপোড়া দর্মার বেড়া, চাঁচের ঘর, পেরিয়ে যাওয়ার সময় মা ডুকরে কেঁদে উঠলো। নকুল মা’র মুখ চেপে হিসহিসিয়ে উঠলো

– শব্দ করিসনে, মা। 

মা নিজেই দিদির মুখে আঁচল ঠেসে বসে আছে। নিজেই ভুলে গেছে। এখন কাউকে কাঁদতে নেই। আতিকুরদাদের বাড়ি ফাঁকা। আগেই পালিয়েছে। ধানের গোলা পুড়ে কালো। খড়ের চাল উঠোনে ধিকিধিকি জ্বলছে। এই উঠোনে নকুলরা পিকনিক করেছিলো। গাঁয়ের বাতাসে পাক খাচ্ছে ছাই। নাকে মুখে ঢুকছে। কাদের ছাই, হিন্দু না মুসলমানের! উড়েপুড়ে একাকার! বাবার মুখ, মাথা গামছা দিয়ে পেঁচানো। চোখদুটো বিড়বিড় করছে। ভ্যানরিক্সার প্যাডেলে আস্তে, জোরে, সাবধানে, প্রাণপণে চাপ দিচ্ছে, কোনো চাপই মানছে না। ক্যাঁচ কোঁচ স্বরে কাঁদছে, গ্রাম ছেড়ে যাবে না।   

বড়ো রাস্তায় পুলিশ টহল দিচ্ছে। আর ভয় নেই। পলিথিন উল্টে নকুল সোজা হয়ে বসে। জিজ্ঞেস করে- বাবা, আমরা কোথায় যাচ্ছি? 

– কোলকাতায়। তোর কাকার বাড়িতে। 

নকুল বলে- কী মজা! কোলকাতায় রাস্তা ভর্তি আলো। মোড়ে মোড়ে পুলিশ, ওখানে ভয় নেই। 

ওরা স্টেশনের পথে ঢুকে পড়েছে। উল্টো দিক থেকে আসছিলো আর একটা ভ্যানরিক্সা। নকুল আনন্দে চেঁচিয়ে ওঠে- বাবা, কাকা। ওইতো সহদেব দাদা, কাকিমা। পুজোর ছুটিতে আসছে।

দু’টো ভ্যান মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতেই নকুল সহদেব দুই ভাই লাফিয়ে নেমে পড়লো ভ্যান থেকে। 

কাকার বাড়ি মানে বস্তি। মাঝরাতে আগুন লেগে শেষ। বস্তির সবাই জানে, প্রোমোটাররা পুড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে আকাশ ছোঁয়া ফ্ল্যাট হবে। নকুলরা দুই ভাই রাস্তা জুড়ে খেলা শুরু করেছে। এ ওর গায়ের ছাই ঝেড়ে দিচ্ছে, ও এর গায়ের। 

17