স্বাধীনতার ৭৫ বছরে ছিটমহলে বসবাসকারী ভারতীয়দের খেপে খেপে তিনবারে তিনঘণ্টার স্বাধীনতার কথা

ওয়েবডেস্কঃ


সারা দেশের সাথে এ রাজ্যেও স্বাধীনতা দিবস পালন হয়েছে মহা ধুমধাম করে।অথচ স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও এ রাজ্যের কোচবিহারের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ভারতীয় ভূখন্ডে বসবাসকারি ভারতীয় নাগরিকদের সারা দিনরাতের মধ্যে মাত্র ৩ ঘন্টা স্বাধীনতা ভোগ করেন! সেই তিন ঘন্টাও আবার এক নাগাড়ে নয়।ভোর থেকে সন্ধ্যের আগে পর্যন্ত খেপে খেপে তিনবারে তিন ঘন্টার স্বাধীনতা!


এ তথ্য অবশ্য দেশের সরকার কিংবা রাজ্যের সরকারের কাছে অজানা কিছু নয়।কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ভারতীয় ভূখন্ডে বসবাসকারি জনগনের দিনযাপনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে আগ্রহী নয় দেশের বা রাজ্যের সরকার কেউই।
মানবিকতা দেখাতে সরকার ছিটমহল বিনিময় করে দুনিয়ার কাছে বাহবা কুড়োলেও দেশের অভ্যন্তরের নাগরিকদের স্বাধীনতা ফেরাতে কোন উদ্যোগই নেয় নি।


কোচবিহার সাংসদ নিশিথ প্রামানিক এখন দেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।তিনিও মানবিক দৃষ্টি নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারের ভারতীয় নাগরিকদের যন্ত্রনা উপশমে এগিয়ে আসেন নি।
কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে বসবাসকারী নাগরিক ওসমান মিয়া,সোলেমান মিয়া কিংবা কলেজ পড়ুয়া সাবিনা খাতুনরা অভিযোগ করছেন প্রায় আড়াই যুগ হতে চললো, তাদের স্বাধীনতা সারাদিন রাতে ৩ ঘন্টায় এসে ঠেকেছে।


তিন দফায় তিনবার খোলে কাঁটাতারের বেড়ার মাঝের গেট।কড়া বিএসএফ প্রহরায়।তখনই উপযুক্ত প্রমানপত্র জমা রেখে ভারতের মূল ভূখন্ডে যাওয়া আসা করা যায়।তারপর গেট বন্ধ।হাজার অনুনয় বিননয়েও খোলে না গেট।
ওসমান মিয়ার নিজের ভাষায়,”১৯৯২ সাল থেকে কাঁটাতারের বেড়া হবার পর থেকেই চলছে এই বন্দীদশা।যাদের কিছুটা টাকাপয়সা ছিল, তারা কাঁটাতারের বেড়া শুরু হবার সময়েই বাড়ি সরিয়ে নিয়ে গেছে মূল ভূখন্ডে।যাদের সে সামর্থ ছিল না, তাঁরা রয়ে গেছেন বেড়ার ওপারেই।তাদেরই একজন ওসমান মিয়ার পরিবার।


ওসমান মিয়া,সোলেমান মিয়া,সাবিনা খাতুন দের মত কয়েক হাজার মানুষ আজও প্রতিদিন স্বাধীনতা খুঁজে বেড়ায়।
কোচবিহার জেলার দিনহাটা,মাথাভাঙ্গা,মেখলিগঞ্জ এলাকায় কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ভারতীয় ভূখন্ডে থাকা নাগরিকের সংখ্যা বেশি।অবাক হবার বিষয় সরকারের কাছে সঠিক তথ্য নেই! ঠিক কত পরিবার এই রকম অসুবিধার মধ্যে দিন যাপন করছেন।
শুধু দিনহাটা মহকুমার কথা ধরলেই চমকে ওঠার মত তথ্য মেলে।দিনহাটা মহকুমায় সীমান্ত এলাকা রয়েছে ১১৩ কিমি এলাকা রয়েছে।এরমধ্যে ৬৩ কিমি এলাকায় এখনও বেড়া বসে নি।বাকি ৫৩ কিমি এলাকায় বেড়া রয়েছে।আর এই ৫৩ কিমি কাঁটাতারের বেড়া এলাকায় রয়েছে ১২৪ টি গেট।যেগুলি বিএসএফের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে।
দিনহাটার নাজিরহাট-১,বামনহাট-২,সাহেবগঞ্জ,
চৌধূরূরহাট, শুকারুরকুঠি,গিতালদহ ও নয়ারহাট-গোবরছড়া এলাকায় আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া অনেক পরিবারই রয়ে গেছে বেড়ার ওপারে।

জন্মসূত্রে এরা ভারতীয়।দেশের নিরাপত্তার কারনে এরা নিজেদের জমির ওপর দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া করবার অনুমতি দিয়েছিল সরকারকে। অথচ এরাই এখন মর্জিমত চলাফেরা করতে পারেন না।এদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত হয় বিএসএফের মর্জির দ্বারা।হাট-বাজার,স্বাস্থ্য,শিক্ষা সব নির্ভর করে গেট খোলা ও বন্ধ থাকার ওপর।
ওসমান মিয়ার মা জরিনা বেওয়া শুক্রবার এসেছিলেন দিনহাটা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ছেলের সাথে।তখনও ডাক্তার দেখানো হয় নি।অথচ ঘরে ফেরার তাড়া আছে।বৃদ্ধার বক্তব্য,বিএসএফের কথা মত চলে তাদের জীবন।সারাদিনে সকালে, দুপুরে আর বিকেলে একঘন্টার জন্য গেট খোলে তার মধ্যেই বাড়ি ফিরতে হবে।বিএসএফের হাতে বন্দীজীবন কাটাচ্ছেন জরিনা বেওয়াও।


কলেজ পড়ুয়া সাবিনা খাতুনের বক্তব্য,সকাল ১০ টায় গেট খুললে কলেজে যাই।কোনদিন তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেলেও বেড়ার ধারে এসে বিকেল অব্দি অপেক্ষা করতে হয়।আবার দেরি হয়ে গেলে বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটাতে হয়।আমাদের বেড়ার ওপারের গ্রামে শিক্ষা,স্বাস্থ্য,পানীয়জল বিদ্যুৎ কোন কিছুই নেই।বিয়ে থেকে যে কোন অনুষ্ঠানে আগে বিএসএফের অনুমতি নিতে হয়।আমরা আসলেই,”নিজভূমে পরবাসী”।স্বাধীনতা দিবস আসে যায়।আমাদের স্বাধীনতা আসে কই?

জয়ন্ত সাহা,মাথাভাঙ্গা,২০/৮/২২

12