বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন রায়গঞ্জের স্বাধীনতা সংগ্রামী নিশীথ নাথ কুন্ডুসহ অন্যান্যরা

সুকুমার বাড়ই

স্বাধীনতা যুদ্ধে দিনাজপুর তথা রায়গঞ্জের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান ছিল। কিন্তু সেই সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে অনেকেই থমকে যান। হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে কলম ধরলেন ইতিহাসের অধ্যাপক সুকুমার বাড়ই

নাম তাঁর নিশীথ নাথ কুন্ডু। রায়গঞ্জের পথের ধারে আছে তাঁর একটি প্রস্তর মূর্তি। একটি গলি পথের নামও রয়েছে নিশিথ নাথ কুন্ডুর নামে। কে এই নিশীথ নাথ কুন্ডু? এর উত্তর খুঁজতে বেরিয়ে পড়তেই দেখা হল ৬৩ বছর বয়সের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী গৌড় গোবিন্দ চক্রবর্তীর সাথে। তাঁর কথায় নামটা জানি। কিন্তু নিশীথ নাথ কুন্ডু সম্পর্কে তেমন জানিনা। করোনেশন হাই স্কুলের ৫২ বছর বয়সী শিক্ষক তপন মন্ডল। তিনি জানান,নিশীথ নাথ কুন্ডু বলে কাউকে জানিনা। বর্তমান প্রজন্মের দশম শ্রেণীর ছাত্রী নীলাঞ্জনা রায়। নিশীথ নাথ কুন্ডু সম্পর্কে জানতে চাওয়ায় সে শুধু খ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, না, এই নামে তো কাউকে চিনি না, জানিও না। এভাবেই রায়গঞ্জের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী নিশীথ নাথ কুন্ডু বিস্তৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট আমাদের দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু এই স্বাধীনতা খুব সহজে আসেনি। অনেক রক্ত ঝরেছে। দেশমায়ের অনেক সন্তানের আত্ম বলিদানের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীনতা অর্জন করেছি। অথচ সেই সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আমরা আজ ভুলতে বসেছি।
নিশীথ নাথ কুন্ডু তাঁর জীবন প্রবাহে গ্রহণ করেছিলেন গান্ধি- সুভাষের মিলিত দর্শন। অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁ মহকুমার হরিপুরে ১৮৯৩ এর ১১ অক্টোবরে তাঁর জন্ম। পিতার দেওয়া এই নাম পরাধীনতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন দেশবাসীকে নিশীথের নাথের মতই আলোর দিশারী হয়ে পরবর্তী জীবনে তাঁর নামকরনের যথার্থতা প্রতিপন্ন করে। পেশায় ছিলেন আইনজীবী।
আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরুর আগেই গান্ধীজীর আহবানে আদালত বর্জন করে নিশীথনাথ ১৯২১ সালে যোগ দিলেন অসহযোগ আন্দোলনে। সত্যাগ্রহে অংশ নিয়ে তিনি করলেন কারা বরণ। জাতীয় কংগ্রেসের যোগ দিয়ে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। উত্তরবঙ্গের ১৯২২ সালের বন্যায় নেতাজীর সঙ্গে ত্রাণকার্যে সহযোগী হয়েছিলেন নিশীথ নাথ কুন্ডু।
১৯২৮ সালের বালুরঘাট মহকুমা দিন পত্নীতলা ও ধামুরহাট থানায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ব্রিটিশ সরকার ছিল নির্বিকার। নিষিদ্ধ নাথ কুন্ডু এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।
১৯৩০ সালের কথা। আইন অমান্য আন্দোলন চলছে চারিদিকে। পাশাপাশি চলছে পুলিশই নির্যাতন। নিশিত বাবু এ সময়ে ছিলেন কলকাতায়। আন্দোলনের কাজে তাকে পাঠানো হলো মেদনীপুরে। রেল স্টেশনের ট্রেন থেকে নামমাত্র তার খাদি পোশাক আর গান্ধী টুপি দেখে ছুটে এলো একদল পুলিশ। একজন ধরেছে তার হাত অন্যজন উদ্যত করেছে বেত। প্রচন্ড ধমক দিয়ে বললেন এসব হচ্ছে কি? অ্যাডভোকেট এসবের প্রতিকারের এসপির সঙ্গে দেখা করলেন। এরপরেই নিশিত বাবু হলেন গ্রেফতার। তাকে দমদম ও আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের কয়েক মাস রাখার পর স্থানান্তরিত করা হলো মেদনীপুর সেন্ট্রাল জেলায়। দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর মুক্তি লাভ করলেন গান্ধী আরউইন চুক্তির পর। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য নিশিত বাবু যেমন ছিলেন উৎসর্গিত প্রাণ তেমন অপর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রক্ষার্থেও তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট। ১৯৩৩ সালে হিলি রেল স্টেশনে অনুশীলন সমিতির উদ্যোগে ঘটেছিল দুর্ধর্ষ স্বদেশী মেল ডাকাতি। এদের হয়ে আইনি মোকাবেলা করেছিলেন তিনি। এছাড়াও অন্যান্য বিপ্লবীদের জন্যেও নিষেধ কুন্ডুর অনেক ভূমিকা ছিল। যাইহোক বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে অবশেষে মেলে স্বাধীনতা।

দেশভাগের পর তিনি রায়গঞ্জে বসবাস শুরু করেন। এখানকার নানা সমাজসেবামূলক কাজের সাথে তিনি ছিলেন ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। রায়গঞ্জ কলেজ , উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ছিল তাঁর অমূল্য অবদান। তিনি সমাজবাদী পার্টি করতেন। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভায় ত্রাণ ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন পারদর্শিতার সাথে। ১৯৫৫ সালে ভারত সরকার রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠন করলে তিনি এই কমিশনের কাছে স্মারক লিপি পেশ করে বিহারের পূর্ণিয়া জেলার বাংলা ভাষাভাষী এলাকা পশ্চিমবঙ্গ ভুক্ত করণের জোরালো দাবি জানান। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুরের সাথে ১৯৫৬ সালে যুক্ত হয় ইসলামপুর মহকুমা। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বাগ্মিতা বলে নিশীথনাথ কুণ্ডু সমগ্র বঙ্গদেশে একজন প্রথম সারির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। একজন সুদক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবেও তিনি আরোহন করেছিলেন খাতির শিখরে। ১৯৭৮ সালে ৯ আগস্ট এই মানুষটির সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। ভেসে এল কবির কথা —
“ তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ
তাই তব জীবনের রথ— চিহ্ন তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই।”

রায়গঞ্জের অনন্য স্বাধীনতা সংগ্রামী রবীন্দ্র কুমার ভৌমিক। সুভাষচন্দ্র বসুর সংগ্রামী আহবান তার মনে এনে দিয়েছিল তীব্র আবেগ ও চঞ্চলতা। সংগ্রামী লীলা রায়ের সাথে তার যোগাযোগ। পুরো মাত্রায় জড়িয়ে পড়েছিলেন ব্রিটিশ শক্তি উচ্ছেদের গোপন কর্মসূচিতে। রায়গঞ্জে গঠন করলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের রায়গঞ্জ শাখা। রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা ও রায়গঞ্জের সরকারি অফিসগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তারা। ১৯৪২ সালের ১২ ই অক্টোবর তিনি গ্রেপ্তার হলেন। তিন বছরের অধিক জেলে থেকে অবশেষে তিনি পান মুক্তি। রায়গঞ্জের অন্যান্য আরো অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন যাদের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সংগ্রামে দেশ হয় স্বাধীন। কৃষক আন্দোলনের নিষ্ঠাবান সৈনিক বসন্ত চট্টোপাধ্যায়, সমাজ সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় সাধনার পুরোধা সুকুমার চন্দ্র গুহ, স্বদেশ প্রেমের উৎসর্গিত প্রাণ রাধিকার অঞ্জন বসু, গঠন কর্মী সতীশ চন্দ্র ঘোষ, স্বাধীনতা সংগ্রামী অনিল চন্দ্র নাগ, দুর্গম পথের পথিক বিমল চট্টোপাধ্যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামী শিক্ষাবিদ সমাজ ও সাংস্কৃতিক প্রেমিক অঞ্চল ভূষণ বসু, স্বাধীনতা সংগ্রামী ঊষারঞ্জন মিত্র, মাটি থেকে উঠে আসা সংগ্রামী বাচ্চা মুন্সি, স্বাধীনতা সংগ্রামী থেকে অনন্য গঠন কর্মীতে রূপান্তরিত মোহিত চন্দ্র সরকার, স্বাধীনতা সংগ্রামী সরোজ কুমার বসু, ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু বিশ্বনাথ চক্রবর্তী, চন্দ্র মোহন বন্ধ্যোপাধ্যায়, গান্ধীজীর ভাবশিষ্য শষধর ভৌমিক। এরূপ আরো বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর আত্মত্যাগে এই ভূমি হয়েছিল স্বাধীন। আজ কালের অমোগ নিয়মে এই সমস্ত বরেণ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম এবং অবদান হারিয়ে যেতে বসেছে স্মৃতির অতলে।

26