কুলিক রোববার: স্মৃতি ৬৯

সাধন দাস

সমুদ্র ও মন্দির দর্শন  

ঠাকুমা চোখ বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। গাঁ গাঁ একটা শব্দ- ক্রমাগত গর্জন হচ্ছে। হতে হতে পায়ের নিচে সরসর বালি, চোখ খুলে দিতেই অকস্মাৎ সোনা রঙ বালির অনন্ত চরা। হুমড়ি খেয়ে পড়ছে শুভ্র ফেনিল জল-পাহাড়েরা। কাচ কাচ নীল নীল কালো কালো জল। যতো দূর চোখ যায় জল, জল আর পাথার পয়োধি পারাবার। দেখতে দেখতে জলের দিগন্তে আকাশ ছুঁয়ে ফেললো বিস্ফারিত চোখ। গর্জন হয়েই চলেছে। ঠাকুমা বললেন- সমুদ্র। 

সমুদ্র গেঁথে গেলো মাথার ভিতরে। বাবা বললেন- বঙ্গোপসাগর। মনে থাকবে? 

কুসুম আভা পুবে। সূর্য ওঠেনি। ঠাকুমা নিচু হয়ে ঝিনুক কুড়াচ্ছে। পায়ের নিচে ভিজে হলুদ বালির চরে ছড়ানো অসংখ্য ঝিনুকেরা। একটা দুটো তিনটে কুড়িয়ে ঠাকুমার আঁচলে জমা দিই, আবারো কুড়াই, কতোদূর, কোথায় না জেনেই ঝিনুক কুড়োতে হাঁটছি। সূর্যের দিকে যাচ্ছি আর পিছন ফিরে দেখছি। কখনও ছুটছি। দেদার মুক্তি। উঁচুলম্বা বাবাকে ছোট্টো দেখাচ্ছে, ঠাকুমা আরো ছোট্ট, যতোদূর যাচ্ছি, যেনো ঝিনুকভূমির অধিকার নিচ্ছি। ফেনিল জলরাশি আমার, আমাদের। বাবার চেয়ে আমার ছায়া লম্বা হয়ে গেছে। ঠাকুমা ছোট্ট সাদা ঝিনুকের মতো বিন্দু হয়ে বসে আছে। যতোদূর রোদ্দুর যায় আমাদের পৃথিবী। লাফিয়ে ওঠা ঘোড়ার মুখে যেনো সমুদ্র বিস্ফোরণ। মুক্তোদানার মতো লাফিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে  জলরাশি। ঠাকুমার কাছে মুক্তোর অনেক গল্প শুনেছি। বাবা বললেন- ঝিনুকের মধ্যে মুক্ত থাকে। 

জলদিগন্তে তাকালাম, অতল গভীর সমুদ্র মুক্তোদানায় ভর্তি।  

পুরীর মন্দিরে, গর্ভগৃহের নিকষ অন্ধকার থেকে বেরুচ্ছি। আলোয় আসতেই চোখে ধাঁধা লাগলো। পলক বন্ধ করেছি। আচমকা মাথায় লাঠির বাড়ি। ঠাস করে কেউ মারলো। ভয় পেয়ে ভীষণ রেগে লাঠি চেপে ধরলাম। হাত তুলে মারতে গেলাম সহজাত স্বঃতস্ফূর্ত আত্মরক্ষার তাগিদে। মেরেছে পাণ্ডা। উফ! সে তখন কী হিংস্র।  লাঠি ছাড়িয়ে নিয়ে বে-ধড়ক মারতে শুরু করলো আমাকে। বাবা ঠাকুমা কাকুতি মিনতি করে আমাকে ছাড়ালেন। পাণ্ডারা বুঝিয়ে দিলো, মার খেয়ে আমার পূণ্যি হয়েছে। সেই পূণ্যবলে মন্দিরের ভিতরটা আমার কাছে ভয়ের আস্তানা হয়ে উঠলো। 

সেবার পুরীতে আমরা একমাস  ছিলাম। মন্দিরের ভেতরে যেতে চাইতাম না। জোর করে নিয়ে গেলে, স্যাঁতসেঁতে, ভ্যাপসা, ধূপ ধুনোর  পাঁচমিশালি গন্ধে দমবন্ধ লাগতো। সিংহিবাড়ির ঠাকুমা মারা গেলে যে ধূপ জ্বালানো হয়েছিলো, মন্দিরময় সেই মরা ধূপের গন্ধ। গোছা গোছা মৃত্যুগন্ধী ধূপের অস্বচ্ছ ধোঁয়ায় পাণ্ডাগুলোকে গুণ্ডা মারকুটে লাগতো। বিশ্রী থ্যাবড়া তিনটে কাঠের মূর্তি, দেবতা! জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলরাম। ওদের হাত নেই। মারতে পারে না। নুলো। পাণ্ডাদের হাতে আমাকে মার খাইয়েছে। ঠাকুমা পাণ্ডার হাত ধরে মন্দিরে যেতো সন্ধ্যে আরতি দেখতে। মন্দিরে যেতে চাইতাম না। দেবতার আরতি দেখার বদলে জেদ ধরে বাবার হাত ধরে সমুদ্রে যেতাম, সন্ধ্যাকালীন বেলাভূমিতে। তখন স্থলভাগকে সামনে রেখে, রাতের শুভ্র-ফেনিল চূড়ায় তিন ভুবনের আলো ছড়িয়ে আরতি করতো সমুদ্র।   

22