কুলিক রোববার মুক্তগদ্য: অভিমানী ভূতেরা

পিয়ালী মিত্র

ছোটবেলায় প্রায়শঃই  সন্ধ্যে হলেই  লোডশেডিং হয়ে যেতো । আর, লোডশেডিং হলেই আমারা ভাইবোনেরা শুধু নয়, পাড়ার কচি-কাচারা সব দল মিলে কারুর না কারুর ঠাকুমা, দিদিমা বা দাদুর কাছে গল্প শুনতে বসে যেতাম । অন্ধকার রাত্রি ; ভূতের গল্প শোনার জন্য সবাই “হা” করে থাকতাম । 

              একটু একটু করে গল্প  এগিয়ে চলতো ;  পরিত্যক্ত পুরোন বাড়ি, সাদা শাড়ি পরা ঘোমটা দেওয়া কেউ একজন, তার পায়ের নুপুরের আওয়াজ ইত্যাদি আরো কতো কিছু । আমাদের লোম তখন খাড়া হয়ে উঠতো । সবাই একে অপরের গা ঘেষাঘেষি করে বসে থাকতাম ।  তখন ভুলে যেতাম, কার সঙ্গে কাল আড়ি হয়েছিলো, কার সঙ্গে আজ সকালেই মারপিট করেছি । সবাই তখন একে অপরের অবলম্বন।  

                     তারপরে লাইট এসে গেলেই গল্প যে অবস্থাতে থাকতো, সেই অবস্থাতেই সভা ভঙ্গ।  গল্প শেষ না হলে কি হবে, ওই আধা গল্পের রেশই থেকে যেতো সারা মনে । 

                     রাতে বিছানায় শুয়েও মনে হতো কেউ বুঝি সাদা শাড়ি পরে ঘোমটা দিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে সারা ঘর জুড়ে । আর, ফ্যানের তলায় শুয়েও কুলকুল করে ভয়ে ঘেমে উঠতাম । সে কি রোমাঞ্চ ! 

            তখন একটা সময় ছিলো । তখন ভূতেদের বাজার খুব গরম ছিলো । সবাই বেশ ভয় – টয় পেতো । ‘তেনা’রা আবার একপ্রকার ছিলেন না ; 

বিবিধ প্রকারের ছিলেন । কেউ পেত্নি, কেউ ব্রহ্মদৈত্যি, কেউ আবার স্কন্ধকাটা , কেউ আবার শাকচুন্নি প্রভৃতি কতো কি !!

              তবে, সব সময়ই যে ‘তেনা’রা শুধু ভয় দেখাতেন তা নয় । অনেক সময় খুশি হয়ে ‘বর’ও দিতেন । মানে তাঁদের সম্মান করলে, ভয় পেলে তাঁরা ‘বর’ দিতেন । 

                কিন্তু, দিনে দিনে তাঁরা তাঁদের সম্মান – টম্মান  ক্রমশঃ হারাতে শুরু করলেন । আজ আর এখন তাঁদের তেমন কেউ অতো ভয় – টয় পায়না । কখনও সখনও তাঁদের ‘ভূত – ফূত’ বলেও অসম্মান করা হয় । আর, এই ‘ফূত’ কথাতেই তাঁদের অভিমান শতগুণ বেড়ে গেছে । আর, তাই তাঁরাও অভিমানে ‘মানুষ – ফানুষ’কে ছেড়ে চলে গেলো ।

             এখন আর অতো সময় কোথায় তাঁদের নিয়ে ভাবার !!! পড়াশোনার চাপ প্রচুর । বইয়ের পাতা থেকে মাথা তোলার অবকাশই নেই । তার উপর আছে ড্রয়িং ক্লাস,  সুইমিং ক্লাস,  ডান্স ক্লাস,  গানের ক্লাস  ইত্যাদি আরো কতো কিছু । নেই সেই যৌথ পরিবারের গল্প বলার দাদু দিদারা, নেই সেই পাড়াঘর, নেই সেই লোডশেডিং । যদিও বা কখনও লোডশেডিং হয়, সঙ্গে সঙ্গে জেনারেটরের আলোয় লোডশেডিং বোঝার উপায় নেই । 

              এখন বাচ্ছারা অনেক জানে । বিজ্ঞান দিয়ে, যুক্তি দিয়ে বিচার না করে মেনে নেওয়ার মতো বোকা কেউ নেই । 

             তাই, সেইসব ভূতেরা অভিমান করে মানুষকে ছেড়ে চলে গেছে । তবে, তাঁরা একা চলে যায়নি । আমাদের বাচ্ছাদের ‘শৈশব’টাকেও  নিয়ে চলে গেছে । 

             আর কি কোন দিনও কোন ‘ভূতের রাজা’ আমাদের বাচ্ছাদের ‘শৈশব’ ফিরে পাওয়ার ‘বর’ দেবে ????

35