কুলিক রোববার প্রবন্ধ : ‘সবাইকে সবার মতো কথা বলতে দাও’

উত্তম দত্ত

ইদানীং যা খুশি লেখার নাম কবিতা। সাহিত্যের এই কলার তোলা মস্তানি আর দাদাগিরিটা শুরু হয়েছিল ডাডাইজমের হাত ধরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে চলেছে তখন। মানুষের নৈতিক বিশ্বাসের জগৎ চূর্ণ হয়ে গেছে। ঈশ্বরের চাইতে ক্ষুধা সত্য। প্রেমের চাইতে যৌন-তৃষ্ণা। চিরাচরিত ঐতিহ্য ও প্রচলিত মূল্যবোধে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে মানুষ। রবীন্দ্রনাথ তখনও যথেষ্ট বেঁচে আছেন। সাহিত্যের এই অনাচারকে তিনি বললেন ‘মাতালের বৈকুন্ঠপুরী’। বললেন এদের মন অসুস্থ। এরা অঘোরপন্থীদের মতো বেছে বেছে কুৎসিত জিনিস খায়, যাতে কেউ বলতে না পারে, ভালো জিনিসের  প্রতি এদের আসক্তি আছে।

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ত্রিস্তান জারা ‘DADA’ নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করেন।’ তার তৃতীয় সংখ্যায়  তিনি বললেন, “যা কিছু প্রচলিত প্রথার সমর্থক তাকে ধ্বংস করো। যা সুনিশ্চিত বিশ্বাসের দ্বারা সমৃদ্ধ – তাকে উৎপাটিত করো, যা কিছু  নৈতিক মূল্যবোধের ঐতিহ্যে লালিত, তাকে ছুঁড়ে ফেল নর্দমায়।”

     ডাডাবাদীরা বলতেন, ‘যা খুশি লেখ, যেমন ইচ্ছে লেখ, সমস্ত রচনাই কবিতা’। 

ছন্দে বাঁধা, অন্ত্যমিলে সাজানো বাকবিন্যাস মানুষের স্বাভাবিক চিন্তার ফসল নয়। সেখানে বুদ্ধি ও মননের কসরত আছে। এই জোচ্চুরিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করো, ধ্বংস করো রাতারাতি’। মহৎ ও কালজয়ী শিল্প-সাহিত্যকে তাঁরা বললেন স্রেফ ধাপ্পা ও প্রতারণা। এবং সেসব অতি বুদ্ধিমান কিছু মানুষের চতুরতা-নির্ভর মানসিক শ্রমের বহিঃপ্রকাশ। ডাডাবাদীদের স্বেচ্ছাচারিতা আর উন্মাদনা কোন্ উত্তুঙ্গ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল তার একটা দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে ত্রিস্তান জারার একটি উদ্ভট কুপরামর্শে :

How to Make a Dadaist Poem

(method of Tristan Tzara)

To make a Dadaist poem:

★Take a newspaper.

★Take a pair of scissors.

★Choose an article as long as you are planning to make your poem.

★Cut out the article.

★Then cut out each of the words that make up this article and put them in a bag.

★Shake it gently.

★Then take out the scraps one after the other in the order in which they left the bag.

★Copy conscientiously.

★The poem will be like you.

★And here are you a writer, infinitely original and endowed with a sensibility that is charming though beyond the understanding of the vulgar.

১৮৯৯ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়েছিল সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সেই যুগান্তকারী বই : ‘দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস’। 

সেই বইয়ের অনিবার্য প্রভাবে ডাডাবাদীরা বললেন, চেতন মনের চাইতে অবচেতন ও অচেতন মনের অনুভবই প্রকৃত সত্য। আর সেই আপাত এলোমেলো ও উচ্ছৃঙ্খল সত্যই প্রকৃত কবিতা। ফলে কবিতা হয়ে উঠল অগোছালো, অবিন্যস্ত, মাথামুণ্ডহীন কবন্ধ-জাতীয় বস্তু।

কিন্তু বেশিদিন এই পাগলামি চলল না। জুরিখের এই ডাডাইজম ১৯১৬ সালে শুরু হয়ে ১৯২৪ এ এসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ক্রমশ এই দিকভ্রান্ত মতবাদ প্যারিসে আরম্ভ হওয়া সুররিয়ালিজম আন্দোলনের সঙ্গে মিলেমিশে একাত্ম হয়ে যায়।

সুররিয়ালিজমের স্রষ্টা ফরাসি কবি গিয়োম অ্যাপোলিনিয়ার। তিনিই প্রথম ১৯১৭ সালে Surrealism শব্দটি একটি চিঠিতে ব্যবহার করেন। তাঁর The Breasts of Tiresias নাটকেও এই শব্দটির ব্যবহার রয়েছে। 

কবি আন্দ্রে ব্রেতোঁ এই আন্দোলনকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন, যাঁকে বলা হয় ‘ দি পোপ অব সুররিয়ালিজম’। ইয়ান গল (১৯২৪, ১ অক্টোবর) এবং আন্দ্রে ব্রেতোঁ (১৫ অক্টোবর) সুররিয়ালিজমের ইশতেহার প্রকাশ করেন। ব্রেতোঁ কবি ও শিল্পীদের বললেন  ‘অচেতন মনের ওপর গুরুত্ব দিন। সেখানেই আছে সত্য ও কল্পনার অশেষ উৎস।’  সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সাইকোএ্যানালিসিসের প্রভাব এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে সাহিত্যে শিল্পে। 

ব্রেতোঁ মনে করতেন, ‘যা বিস্ময়কর, তা শাশ্বত সুন্দর’। অচেতন মনের গভীর অন্ধকারেই সেই বিস্ময়কর সুন্দরের ঘরবাড়ি। তাকে অনুসন্ধান করাই কবি ও শিল্পীদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সালভাদর দালি বলতেন, ‘সুররিয়ালিজম একটি ধ্বংসাত্মক বিষয়, যা দৃষ্টির সীমাবদ্ধতাকে ধ্বংস করে। ’ 

তাঁরা বোঝাতে চাইলেন, সুররিয়ালিজমের কল্পনা ও ধারণা নিছক উন্মাদনা নয়। এতে স্বপ্ন ও বাস্তবের এক বিস্ময়কর মিশ্রণ ঘটে বলে একে স্বপ্নবাস্তবতাও বলা যেতে পারে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে সুররিয়ালিজম আন্দোলন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু সুররিয়ালিজমের চর্চা এখনও অব্যাহত। বাংলা কবিতায় এর নিদর্শন রয়েছে জীবনানন্দ দাশ, উৎপল কুমার বসু এবং আরও অনেকের লেখায়। একটি সাক্ষাৎকারে উৎপল কুমার বসু জানিয়েছেন :

“এই স্যুরিয়্যালইজম কোন স্বতন্ত্র ব্যাপার নয়, জীবনের সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। যা একই সঙ্গে লেখা, ছবি আঁকা ও সিনেমাকে প্রভাবিত করেছে। আমরা কিন্তু বহুকাল ধরেই পরাবাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত। ব্রেঁত, দালি – এদের বহু আগে থেকেই আমাদের প্রাচ্যের শিল্পচেতনায়, জীবনচর্যায় বারবার পরাবাস্তবতার বোধ খেলা করেছে। আমরা বারবার গল্পে ম্যাজিক রিয়্যালিটি থাকলে কোন প্রশ্ন করিনা। ধ্যুর… বলে উড়িয়ে দিইনা। এখন ন্যারেটোলজি নামে জ্ঞানচর্চার একটা সেক্টর তৈরি হয়েছে। কিন্তু তোমরা ভাবতো কতদিন আগেই সাধু ফকিররা এই ন্যারেটোলজির চর্চা করেছেন।” (অতনু সিংহের নেওয়া সাক্ষাৎকার ২০০৯)

জীবনানন্দের ‘ঘোড়া’ কবিতাটিকে সহজ বুদ্ধির যুক্তি দিয়ে সরল ব্যাখ্যা করা আদৌ সম্ভব কি? বরং বলা ভালো,সুররিয়ালিস্ট কবিতার একাডেমিক ব্যাখ্যা করতে চাওয়া উচিত কি?

“আমরা যাইনি ম’রে আজো -তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়;

মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে;

প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন -এখনো ঘাসের লোভে চরে

পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর প’রে।

আস্তাবলের ঘ্রাণ ভেসে আসে 

এক ভিড় রাত্রির হাওয়ায়;

বিষন্ন খড়ের শব্দ ঝ’রে পড়ে ইস্পাতের কলে;

চায়ের পেয়ালা ক’টা বেড়ালছানার মতো -ঘুমো-ঘেয়ো

কুকুরের অস্পষ্ট কবলে

হিম হয়ে নড়ে গেল ও-পাশের পাইস্ -রেস্তরাঁতে,

প্যারাফিন -লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে

সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে;

এইসব ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্ধতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে।”

শুরু করেছিলাম ইদানীংকার কবিদের শব্দ ও কবিতা নিয়ে অদ্ভুত স্বেচ্ছাচারিতার প্রসঙ্গ দিয়ে। যেহেতু কবিতার কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, পূর্বনির্ধারিত কোনও গঠনশৈলী নেই, সেহেতু প্রত্যেকে তাঁর নিজের মতো একটা শৈলী নির্মাণ করে কবিতার মতো দেখতে কিছু শব্দের প্রতিমা রচনা করে চলেছেন। সেসব নিয়ে বইও হচ্ছে। তারই মধ্যে কারো কারো লেখা পাঠকের চেতনায় স্থায়ী স্বাক্ষরও রাখছে। অধিকাংশেরই ঝোঁক অক্ষরবৃত্তে। কেউ কেউ সমস্ত বৃত্ত-ভাঙা বাকরীতিতেই কবিতা লিখছেন। শঙ্খ ঘোষ খানিকটা মজা করে যার নাম দিয়েছেন ‘ব্যক্তিগত ছন্দ’। ছন্দকে ভালো করে জেনে তারপর ছন্দ ভাঙার কথা বলেছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় :

“ভাঙারও নিজস্ব এক ছন্দ আছে, রীতি-প্রথা আছে,

এবড়োখেবড়োভাবে ভাঙলে, ভাঙার বিজ্ঞান থুতু দেবে

গায়ে আর লোকে বলবে, একেই তছনছ করা বলে।

অশিক্ষাও বলে কেউ, বলে, মূর্খ, ভাঙা শিখতে হয় —

অপরূপভাবে ভাঙা, গড়ার চেয়েও মূল্যবান

কখনো-সখনো!”

ধ্বংসাত্মক ডাডাবাদীরাও জানতেন তাঁরা কী ভাঙছেন? কেন ভাঙছেন? সম্প্রতি যাঁরা লিখতে এসেছেন, প্রত্যাশা করি, তাঁরাও একদিন জেনে নেবেন ‘ভাঙার বিজ্ঞান’। অন্তত নেওয়া উচিত। তারপর না হয় বিখ্যাত সেই স্মার্ট কবির মতো বলা যাবে :

“সমস্ত চলুক।

কাকে যে কবিতা বলে

তা কি আমরা স্পষ্টভাবে জানি?

সবাই যে যার মতো কবিকে সংগ্রহ করে

বাড়ি চলে যাক।

কফি হাউসে, বাচ্চা-কবিরা সব

টেবিল-চেয়ার নেড়ে

নস্যাৎ করুক একে ওকে।

তারপর অন্ধকারে বৃষ্টি নেমে এলে

ভিজে পায়ে হেঁটে যেতে যেতে

আমরা হঠাৎ হয়তো কবিতার দেখা পেয়ে যাব।

… সমস্ত চলুক। সব কিছু।

সবাইকে সবার মতো কথা বলতে দাও।”

17