কুলিক রোববার: স্মৃতি ৬৮

সাধন দাস

গান শেখা ২ 

মাস্টারমশায় কবে যে বাবার সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যত এবং প্রশংসার রঙীন বেলুন উপহার দিয়েছিলেন, জানি না। কিন্তু কোনো বেলুন নয়, সন্তানের জন্যে স্নেহই বাবাকে এতো কষ্ট সহ্য করার শক্তি দিয়েছে। বাবা গান আমাকে ছাড়তে বলেননি। বলেছিলেন- আমরা গরিব, টাকা আর সময় আমাদের নেই। 

ছেলেমেয়েদের মানুষ করে তুলতে হাঁপাতে হাঁপাতে মরে যাওয়া পর্যন্ত তাদের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।   

গিটারে মাসখানেক ডা রা ডি রি, না করতেই বুঝে গেলাম, স্কুল তো নয়, খরচের আখড়া। আজ চাঁদা, কাল ফাংশনের টিকিট, পরশু পিকনিক, মাস গেলে মাইনে। বললাম- মাস্টারমশায়, আমি আর শিখবো না। বাবা বলেছেন, সময় আর টাকা আমাদের নেই। 

মাস্টারমশায় মুখ আকাশে তুলে খাদের ‘সা’ য়ে গলা নামিয়ে প্রতিধ্বনি ওঠা গাম্ভীর্যে হেসে উঠলেন- সময়! কারো বাবার সম্পত্তি নয়, সাগরের ঢেউ। ঝুঁটি চেপে যে ঘাড়ে বসতে পারবে তার। টাকা তোর লাগবে না। গান তুই শিখবি। 

– না। বিনি পয়সায় শিখবো না। 

– বেশ, তুই যখন বড়ো হয়ে গান শেখাবি, টাকা নিবি না। শোধবোধ হয়ে যাবে। 

– যদি গানের মাস্টার না হই?  

– প্রতিজ্ঞা কর, গান ছাড়বি না। 

– না মাস্টারমশায়, গরিব আমরা। এ প্রতিজ্ঞা করতে পারবো না। 

একটু থেমে বুক ঠুকে বলেই দিলাম- গান তো প্রতিজ্ঞা করতে পারে, আমাকে ছেড়ে যাবে না। 

– থাক, পাকামি করতে হবে না। ক্লাসের পর আমার বাড়িতে আয়।  

দীপক গানে ফোর্থ ইয়ার, আমি গিটারে হাতেখড়ি। মাস্টারমশায় দু’জনকে জুড়ে দিলেন। টাকার অভাবে দু’জনেরই গান বন্ধ হতে বসেছে। মাস্টারমশায় রাত জেগে জেগে দু’জনকে চা ব্লেণ্ডিং, প্যাকিং, মার্কেটিং শেখালেন। চা-পাতার দোকানে বাকির ব্যবস্থা করে দিলেন। চা বেচতে বেরিয়ে পড়লাম দু’জনে।  

লক্ষ্মীদিদি ফিফথ ইয়ার। ওর বাড়ি চা বেচতে গেলে গানের আড্ডা শুরু হয়ে যায়। বেলা গড়িয়ে দুপুর। চা বিক্রি আর হয় না। ওখানেই খেয়েদেয়ে ফিরি। কাউকে জানতে দিই না, বাড়িতে আর একবার খেয়ে নিই। গুপিদা স্কুলে সেতারের ছাত্র। পাথরের মতো বসে সেতার বাজায়। কাফি রাগের পকড় শোনায়, সা রেরে গা মামা পা… বাবরিচুল ঝাঁকিয়ে মুখে গায়,  ঠাকুরদাদা পেয়ারা খায়ইই…। কথাও বলে না। চা-ও কেনে না। না খেয়ে দুপুর কাটে। শংকর ঘোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের শংকরজ্যাঠা কীর্তন গান করেন। পেট থেকে মাথা পর্যন্ত তম্বুরা, সুরে টইটুম্বুর। ডেলি আড়াইশো গ্রাম চা-  সঙ্গে কীর্তনে গেলে চা কিনবেন। অগত্যা যাই। চা পান বিড়ির দোকানী রাম। বিড়ির কারখানা আছে। তামাকে আফিংয়ের জল মেশায়। ওর বিড়ি খেলে লোকে অন্য বিড়ি খায় না। হেবি বিক্রি। পাইকিরি রেটেই দেয়। চায়ের দাম মেটে আমাদের বিড়ি বেচা টাকায়। চায়ের সঙ্গে বিড়িও বেচি। আফিং মেশানো বিড়ি জানতে পারলে পুলিশে ধরবে। 

মাস্টারমশায় শুনে বললেন- নাহ, চায়ের ব্যবসা তোদের কম্ম না।  

16