কুলিক রোববার: স্মৃতি : ৬৭

সাধন দাস

গান শেখা ১ 

ধোপাঘাট। রোদ্দুরে ঝলসাচ্ছে ইছামতি। কূলে ধোপারা কাপড় ঠ্যাঙাচ্ছে, হুউশ্‌রাম হুউউউশ্‌রাম। সবুজ সবুজ পাড়ে গনগনে সূর্যের তাপ। ছোট্ট ছেলেটা, ব্লিচিংপাউডারে ডোবানো কাপড়, নিংড়ায়, মেলে, তোলে। ঘেমে নেয়ে হাঁপায়। কোনো ছায়া নেই। আকাশ নিরেট নীল। কোনো মায়া নেই। মুখ তুললে কপাল গড়িয়ে ঘাম ঝরে, চোখ জ্বালা করে। বাতাসের টানে শ্যামলী রঙের মেঘ হঠাৎ রোমাঞ্চকর ভাবে নেমে আসে। ছায়া পড়ে মাটিতে। ব্যতিক্রমী ছায়া নদী মাঠ ঘাট পেরিয়ে যায়। শীতল নদীর স্রোতে মাঝির গান, সুরেলা নৌকায় যেমন ভেসে যায়, ছায়া সুনিবিড় শীতলের লোভে ছেলেটা মেঘের ছায়ার নিচে উষ্ণ মাটির বুকে ছোটে। ছুটতে ছুটতে মাঝির মতো ভাসতে ভাসতে গান ভালোবেসে ফেলে!  

ছেলেটা কলেজে ভর্তি হয়ে একগাদা টাকা স্টাইপেণ্ড পেলো। বছরের মাইনে দিয়ে, বই কিনে হাতে তবু টাকা! কী করবে! একটা গিটার কিনে ফেললো। পুরনো, রঙচটা। চন্দনরঙা পেটে সুগোল গর্ত। গভীর অন্ধকার নাভি। নাভির গুহা থেকে সুর উঠে আসে। শীতল নদীর মতো, পোড়া মাঠের মতো, নির্মায়া আকাশের মতো, মায়াময় রোদ্দুরের মতো ঝলকায় আর শ্যামলী ছায়ার কথা মনে ঘনিয়ে তোলে। তরুণ ছেলেটা গিটারটিকে বুকে বেঁধে তাকে মনের কথা বলতে শেখায়। দু’জনে রাত জাগে, কথা আর সুর খোঁজে। 

প্রদ্যোৎ বন্দ্যোপাধ্যায় লম্বা, চওড়া, ডাকসাঁইটে মানুষ। লক্ষ্মৌ থেকে গান শিখে এসেছেন। দরাজ গলা। নাভি থেকে তারানার গমক ওঠে গমগমে গিটকিরিতে। গানের স্কুল খুলেছেন দত্তপাড়ায়। স্টাইপেণ্ডের অবশিষ্ট টাকায় ভর্তি হয়ে গেলাম। বাবা বললেন, গান শেখো আপত্তি নেই, সময় আর টাকা দিতে পারবো না। 

তার মানে সকালে কাপড় কাচার চাতালে ময়লা জামা কাপড়ে ব্রাশ ঘষো, কলেজ ফেরতা কয়লা আনো, ভাটি সাজাও, ফাঁক ফোকরে লণ্ড্রিতে বসে খরিদ্দার সামলাও। ব্যায়লা ( গিটার) শিখতে হলে নিজে টাকা আয় করে শেখো। 

গানের স্কুলে ভাতখণ্ডেজীর জন্মদিন। ঘরোয়া অনুষ্ঠান। সব্বাইকে পারফর্ম করতেই হবে। শতরঞ্চি পেতে, হারমোনিয়ম, বাঁয়া তবলা টানাটানি করে ফুলে ফুলে সাজিয়ে, চা জল এনে ছুটোছুটি করে আর ভাতখণ্ডেজীর জীবনী থেকে টুকলি পাঠ করে এমন পারফর্ম করলাম। মাষ্টারমশায় বুঝে গেলেন এ ছেলে ছাড়া যাবে না তাহলে স্কুলের সমূহ ক্ষতি। 

মহালয়া। চণ্ডীপাঠ হবে। মাস্টারমশায় মহিষমর্দিনীর স্তোত্রে নতুন গান জুড়বেন। – সাধন, গান চাই। 

ভয়ে ভয়ে লিখে নিয়ে গেলাম, 

‘মোম জোছনায় হাস্নুহানা ছড়িয়ে দিলে গন্ধ

বিহগ মন বিবাগী হয় শারদ তোলে ছন্দ

বন জোনাকি আকাশ তারায়

ছড়ায় ছড়ায় আলোক ছড়ায়

ব্যথায় গুহায় বিষাদ ঘুঘু নিশাস রাখে বন্ধ… ’

(এ টুকুই মনে আছে।) 

এরকম আরও কয়েকটা গান মাস্টারমশায়ের পছন্দ হলো। 

ষষ্ঠীর সন্ধ্যে, সাইকেলের পিছনে কাচা, ইস্ত্রি করা কাপড়ের বিশাল বোঝা। লণ্ড্রিতে বসে দোকানদারি করতে হবে, যাচ্ছি। দূর থেকে শুনলাম, সিংহিবাড়ির মাইকে আমার লেখা গান বাজছে। প্যাণ্ডেলের নিচ দিয়ে রাস্তা। ভীড়ে ভীড়াক্কার। যাচ্ছি। আকাশে বাতাসে আমারই সুরেলা অস্তিত্ব। অনাস্বাদিত রোমাঞ্চে টানটান আমি। মুখ লাল হওয়া লজ্জায় শরীরে অতিরিক্ত শক্তি চনমন করে উঠলো। আনন্দে তিরতির করে কাঁপছি। নিজের অজান্তেই সাইকেল থেকে নেমে পড়েছি। হেঁটে প্যাণ্ডেলটুকু পেরিয়ে যাচ্ছি। তখনই মাস্টারমশায় স্টেজ থেকে লম্বা হাত উঁচিয়ে এমন হাঁক দিলেন, চমকে গেলাম। কিছু বোঝার আগেই দু’তিনজন ঘেঁটি ধরে তুলে আমাকে বসিয়ে দিলো স্টেজে। মাস্টারমশায় পরম মমতায় ঘোষনা করলেন, এই সেই ছেলে যার গান আমরা গাইছি। কাপড়ের গাঁটশুদ্ধ সাইকেল, প্যাণ্ডেলের খুঁটিতে কাত হয়ে রইলো। মনে পড়লো, দোকানে পুজোর ভীড়, ঠাসা খরিদ্দার। বাবা একা সামলাচ্ছেন। 

দোকানে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, ভীড় পাতলা হয়ে এসেছে। বাবা কাজ করছেন ধীরে। আর পারছেন না। হাঁপানির রুগি। মুখ ভর্তি ঘাম। বুক হাপরের মতো উঠছে নামছে। ক্লান্ত চোখে তাকালেন। কিছুই বললেন না। 

রেগে ওঠার ক্ষমতাটুকুও তাঁর নেই। আমাকে দেখে, হাঁটু ভেঙে দোকানের টুলে ধপ করে বসে পড়লেন। 

আনন্দের পাহাড়ে ভূমিকম্প। চারদিকে ধ্বস, অন্ধকার, ভয়। শীতল অপরাধী মনে হলো নিজেকে। নীল হয়ে যাওয়া লজ্জায় তিরতির করে কাঁপছি। মনের শক্তি হারিয়ে মিশে যাচ্ছি মাটিতে। 

মাথা নিচু করে বললাম- সিংহিবাড়ির প্যাণ্ডেলে দেরি হয়ে গেলো বাবা, আমি আর গান শিখতে যাবো না। 

20