কুলিক রোববার: সাহিত্য প্রসঙ্গ: পর্ব ৫

“আমার আছে জল” লিখার পর হুমায়ুন আহমেদ এর বই এর দেশব্যাপী কাটতি

ভাস্কর চৌধুরী

  বইটি বের হবার পর হুমায়ুন আহমেদ আমাকে এক কপি উপহার দিলেন। লিখতে ভুলে গেছি, “এইসব দিনরাত্রি” লিখার ফাঁকেই হুমায়ুন ভাই ১৯৭১ নামে একটি ছোট উপন্যাস লিখেছিলেন। আমি স্মোকার হলেও আমার কাছে এক কার্টুন বেনসন বাড়তি ছিলো। সেটি তাঁকে দিতেই তিনি খুব সহজ ভাষায় বই উপহার দেয়ার সময় লিখলেন “আমার একমাত্র সিগারেট সরবরাহকারী।” আমি লজ্জা পেলাম খুব। আর কোনোদিন আমি তাকে কোনো উপহার দিই নি। বড় সাংঘাতিক তাঁর নীরব বাক্যবান। 

  ‎ ১৯৮৭ সালের বইমেলায় হুমায়ুন আহমেদ নিজের লিখার সামর্থ্য জানিয়ে দিতে পেরেছিলেন। গোটা ফেব্রুয়ারি আমরা বইমেলায় প্রচুর আনন্দ করেছিলাম। কিন্তু আমি হুমায়ুন ভাইকে খুব একটা উত্তেজিত হতে দেখিনি। তিনি হয়তো ১৯৮৮ সালের বইমেলার বই নিয়ে অনেক প্রকাশকের সঙ্গে কথা দিচ্ছিলেন। তখন পর্যন্ত তিনি প্রতি বই এ খুব বেশি দাবি করতেন না। তবু অনিন্দ্যর নাজমুল তাঁকে মৌচাকের মোড়ের শো রুম থেকে নাজমুল সুবারুর বদলে একটি বড় সুন্দর দামি গাড়ি কিনে দিনেন। এটি ছিলো “আমার  আছে জল” লিখার জন্যে ভালোবাসার উপহার। আমি তাঁকে আমার সাতাশী সালে বের হওয়া তিনটি গল্পের বই উপহার দিয়েছিলাম।। তিনি বললেন, আমি অবশ্যই পড়বো।

  ‎  তিনি কথা রেখেছিলেন। 

  ‎ ঢাকায় চাকুরী করে সংসার চালানো আমার জন্যে অসম্ভব হয়ে যায়। ফলে আমি রাজশাহী ফিরে যাই।

এর কিছুদিন পর আনন্দ বিচিত্রায় হুমায়ুন ভাই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন , ইমদাদুল হক মিলন ও ভাস্কর চৌধুরীর লিখা তাঁর ভালো লাগে। খুব সৎ একটি সাক্ষাৎকার ছিলো সেটি। 

  ‎ রাজশাহীতে আমি আমার গুরু হাসান আজিজুল হক স্যারের সান্নিধ্য রোজই পেতাম। বিশ্ব বিদ্যালয় ক্লাবে রোজ আড্ডা হতো।

  ‎ কিন্তু লিখার সময় পেতাম না। আড্ডা , ঘুম ও মধ্যরাত্রি পর্যন্ত আড্ডা আর অফিস। লিখা ও প্রকাশক লেখকদের উপর মনে আর তেমন টান নেই। 

  ‎ কিন্তু গল্প কয়েকটি নিরীক্ষামূলকভাবে লিখেছিলাম। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় ছেপেছিলো। ১৯৮৮ সালের বইমেলা ঘুরতে গেলাম একদিন। হুমায়ুন ভাই এর সাথে দেখা। বললাম, আমিও রাজশাহী গেলাম, আপনিও আমাকে ভুলে গেলেন। তিনি হন্তদন্ত হয়ে একটা বই স্টল থেকে ইরানা নামে একটি নতুন বই নিয়ে এলেন। অনেকটা কল্পকাহিনী। বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে লিখা। বইটি আরম্ভ করার আগে, তিনি আমার একটি কবিতা ব্যবহার করেছেন। যে কেউ দেখতে পারেন। এর আগে এইসব দিনরাত্রিতে তিনি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা ব্যবহার করেছিলেন। নিচে গুণ দার নাম ছিলো। কিন্তু আমার কবিতা তিনি ভালোবেসে ব্যবহার করলেন অথচ নীচে লেখক হিসেবে আমার নাম দিলেন না, আমি মানতে পারলাম না। তিনি বললেন, পরের সংস্করণে নাম লিখে দেবেন। আর কোনো দিন তিনি কবিতার নীচে আমার নাম ব্যবহার করেন নি।

  ‎  ১৯৮৬ বই এ প্রকাশিত কবিতা সেটি। তিনি বললেন, দেখুন আপনাকে মনে রাখি বলেই এই কবিতা ব্যবহার করেছি। আমি আপনাকে ভালোবাসি ভাস্কর। এই বলে তিনি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। আমার মনে হলো, কোনো লেখকের লিখাকে দাম দেয়ার মতো মনের অবস্থা এখন এই জনপ্রিয়তার উর্ধাকাশে তাঁর নেই। 

  ‎ আরেকটি গল্প বলি। একদিন রাজশাহী নিউমার্কেটে আমি বই এর দোকানে বই খুঁজছি। এমন সময় একজন ক্রেতা বই এর দোকানে বই এর একটি লিস্ট দিলেন। দোকান মালিক, সতেরো টি বই এর মধ্যে তিনটি বই খুঁজে পেলেন। ক্রেতা বললেন , খুঁজবো কোথায়? 

  ‎ আমি বই এর লিস্টটি পড়ে দেখলাম। সব হুমায়ুন আহমেদের বই। কে পড়বে? আমি জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমার ছোট বোন। ক্লাস নাইনে পড়ে। তিনি নিয়ামতপুরের মতো একটি প্রত্যন্ত এলাকায় থাকেন। আমি বুঝে উঠলাম, লেখক হুমায়ুন আহমেদ তৃণমূলের কোথায় চলে এসেছেন। একজন লেখকের জন্যে এর চে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

8