সখ থেকেই বিনা পারিশ্রমিকে ১৭ বছর ধরে পড়িয়ে চলেছেন ৮৫ বছরের  অবসরপ্রাপ্ত যুবক প্রফুল্ল সেন

ওয়েবডেস্কঃ

মনের ইচ্ছে মানুষকে কত কিই না করায়। ইচ্ছের সামনে বয়স কখনোই বাঁধা হয় নি কখনো। সেই উদাহরণ রায়গঞ্জের রায়পুর গ্রামের বাসিন্দা প্রফুল্ল সেন। নিজের কর্মজীবনের কারনে গ্রামের ছেলে মেয়েদের পাঠ দানের ইচ্ছে থাকলেও তা করে উঠতে পারেননি। কিন্তু ইচ্ছে প্রবল ছিল। তাই সুযোগ ও সময় দুটোর অপব্যবহার করেননি তিনি। কর্মজীবন থেকে অবসর কিছু সময় পর থেকে টানা ১৭ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়ে চলেছেন গ্রামের দুস্ত ছেলে মেয়েদের।বর্তমানে প্রফুল্ল বাবু ৮৫ বছরে যুবক। নিজের কর্মজীবনে ভারত সরকারের বর্ডার সিকিউরিটি অর্গানাইজেশন দপ্তর অফিসের সুপারেনটেন্এ পদে কর্মরত ছিলেন। যার ফলে সে সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে দৌড়ে বেড়াতে হতো। অবসরের পর নিয়ম করে দুবেলা চলছে প্রফুল্ল বাবুর ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষাদান। এবছর প্রফুল্ল বাবু ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেনীর ৩০ জন ছাত্র ছাত্রীকে পড়াচ্ছেন সম্পুর্ন বিনা পারিশ্রমিকে।

 বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় দশা তাদের শুধু পাঠদান করেন না তিনি সেইসঙ্গে তাদের হাতে নিয়মিত বই,খাতা,কলম তুলে দেন।আশপাশের 

প্রফুল্লবাবুর যৌবনকালে ইচ্ছে ছিল উচ্চ শিক্ষিত হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান করবেন।কিন্তু পারিবারিক আর্থিক দূরাবস্থার কারনে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি।স্নাতক হওয়ার আগেই তাকে ভারতীয় সীমান্ত সুরক্ষা সংগঠনে জওয়ান পদে যোগ দিতে হয়।পরবর্তীতে চাকরি ক্ষেত্রে পদোন্নতি ঘটে তাঁর।  এরপর দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়ে ২০০২ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন গ্রামের শিক্ষা প্রসারের কাজে যুক্ত হবেন।সেভাবে নিজেকে তৈরি করতে শুরু করেন।বাড়ির পাশেই রায়গঞ্জ ভারত সেবাশ্রম সংঘের মাধ্যমে গড়ে তোলেন বাচ্চাদের একটি স্কুল।গ্রামগঞ্জের প্রায় ২০০ পড়ুয়া সেখানে পড়াশোনা করে।সেখান থেকেও কোনো পারিশ্রমিক নেন না।

২০০৬ সাল থেকে তিনি গ্রামের দুঃস্থ পড়ুয়াদের বিনা পারিশ্রমিকে ইংরেজি পড়াতে শুরু করেন।প্রথমে নবম ও দশম শ্রেণির পড়ুয়াদের নিয়ে নিজের পাঠভবনে পাঠদান শুরু করলেও পরবর্তীতে গ্রামের দিন আনা দিন খাওয়া  পরবিবারগুলোর ছেলে-মেয়েদের কথা ভেবে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পড়াতে শুরু করেন। বর্তমানে  প্রায় ৩০ জন ছেলে – মেয়ে দুইবেলা ইংরেজি পাঠ নেয়।প্রফুল্লবাবুর স্ত্রী মঞ্জু সেন স্বামীর এই কাজকে সবসময়  খুব উৎসাহ দেন।প্রফুল্লবাবু ও মঞ্জুদেবীর তিন ছেলে- মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে ছত্রিশগড়ে এবং দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে হয়েছে দিল্লিতে।ছোটো ছেলে দেবব্রত দিল্লিতে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে ডেপুটি ম্যানেজার এবং সেখানকার একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেন বৌমা অনিন্দিতা।গ্রামের ছেলে-মেয়েদের কথা ভেবে রায়গঞ্জের রায়পুর গ্রামের  বাড়িতে  প্রফুল্লবাবু ও মঞ্জুদেবী দুইজন থাকেন।

প্রফুল্লবাবু বলেন,শিক্ষকতা করার খুব ইচ্ছে ছিল,কিন্তু সেই ইচ্ছে পূরণ হয়নি।তাই অবসরের পর  শিক্ষকতা করার জন্য নিজেকে তৈরি করে ফেলি।গ্রামের ছেলে-মেয়েদের  ইংরেজি শেখানোর ২০০৬ সাল থেকে নিজের বাড়িতে পাঠভবন গড়ে তুলি।সেই সময় থেকে  গ্রামের দুঃস্থ ছেলে-মেয়েদের  সহজ – সরল ভাষায়  ইংরেজি  পাঠদান দিচ্ছি।প্রতি বছর ১০  থেকে ১৫ জন পড়ুয়া  মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়। এবছর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাঠদান দেওয়া শুরু করেছি।তিনি বলেন,গ্রামের দুঃস্থ ছেলে-মেয়েরা শিক্ষক নিতে পারে না।আবার তারা ইংরেজি বিষয়কে ভয় পায়।সেই কারনে আমার এই চেষ্টা।  

 প্রফুল্লবাবু  বলেন, গ্রামের দুঃস্থ  ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে না পেরে খেলাধুলোয় মেতে থাকে। লেখাপড়া ভুলে যাচ্ছে। অর্থের অভাবে অনেকেই তাঁদের বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়াতে পারছেন না। গ্রামের শিশুরা যাতে লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত না হয়,সেজন্য  যতদিন গ্রামের পড়ুয়াদের এই ভাবে লেখাপড়া শিখিয়ে যাব।প্রফুল্লবাবু বলেন,বয়স ৮৫ হলেও আমার কোনো  ক্লান্তি নেই।শিক্ষাদানে আরও শিক্ষালাভ করা যায় এবং পড়ুয়াদের মাঝে পাওয়া যায় অপার আনন্দ।যা পেনশন পাই তা দিয়ে ভালো মতো দিন কেটে যায়।  গ্রামের ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা আমার প্রাণ।গ্রামের বাসিন্দা প্রনব দেবনাথ বলেন,তাঁর মতো মানুষ বর্তমান সমাজ বিশেষত যুবদের কাছে প্রেরণা। উনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রামের দুঃস্থ ছেলে-মেয়েদের পাঠদান করে থাকেন।পড়ুয়াদের অভিভাবকেরা জানান,প্রফুল্লবাবু একজন নিষ্ঠাবান ও সেবাপরায়ণ শিক্ষক।উনি না থাকলে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যেত। গত ১৭ বছরে প্রফুল্লবাবুর বহু প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী  উচ্চশিক্ষিত হয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।সকলের ভালোবাসায় গ্রাম ছাড়তে পারেননি তিনি,ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সারা বছর মেতে থাকেন। 

8