কুলিক রোববার: স্মৃতি ৬৬

সাধন দাস

ঘরে ফেরা 

ভায়া মিডিয়া করে খবরটা বাবার কানে দেওয়া হয়েছিলো। নাতি হয়েছে। নাতি নাকি বংশের নয়। বাবা উত্তেজিত হননি। এ্যাদ্দিনে বাবা বুঝে গেছেন, এ সমস্ত, চাকরি করা ছেলে, স্কুলের নামকরা ছাত্রী বৌমা নিয়ে সুখে ঘর করতে না দেওয়ার ষড়যন্ত্র, মেয়েলি ভাষায় যাকে বলে ‘ভাংচি’। কিন্তু একা বুঝলে হবে না। পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বাস করতে হলে সরেজমিনে তদন্ত করাতে হবে। সবার সামনে ঠাণ্ডা মাথায় রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখাতে হবে। তিনি জানেন, মেয়ে খারাপ নয়। ছোট্টবেলা থেকে তিনি দেখছেন। ছেলের কাছে পড়তে আসে। পায়ে পায়ে গবাড়ির মেয়ের মতো ঘুরে বেড়ায়। ভীষণ ন্যায় নীতি বোধ, পরিশ্রমী, জেদী মেয়ে। অভাবী হতে পারে, তাঁদেরও নাম করা বনেদি বংশ। আদর্শবাদী বাবা, শিক্ষিতা মা। মেয়ে যাকে বলে, অভাবে পোড়া সোনা। কিন্তু এসব তাঁর একার জানা।  যড়যন্ত্রকারীদের কথায়, গরিবি, যৌবন, নারীত্ব, অল্প বয়স… পিছলে যাওয়ার অনেক নাবাল পথ, আর নানান সাত পাঁচ কথা। বাবা ঠিক করলেন, দু’চারজন ভালো লোককে সঙ্গে রেখে পরামর্শ নিতে হবে। যাকে তদন্তে পাঠাতে হবে, সত্যসন্ধানী হওয়া চায়। অভিযোগ সত্যি হলে, দোষ ছেলের, ছেলেকে (অর্থাৎ আমাকেই) ত্যাজ্যপুত্র করবেন।   

অতি চালাকদের সস্তা রটনা। এক ষড়যন্ত্রে বাড়ি ছাড়া করতে পেরেছে। আর এক ষড়যন্ত্রে বাড়ি ফেরার রাস্তা বন্ধ করার আর বাবার মন আরো বিষিয়ে দেওয়া চেষ্টা। বিষে বিষক্ষয়। চালাকির থোঁতা মুখ ভোঁতা করে আমাদের বাড়ি ফেরা সহজ হলো। বাবা ছোটোপিসিকে তদন্তে পাঠিয়েছিলেন। পিসি পাঁচ মেয়ে এক ছেলের মা। ঘাটে মাঠে ঘাম ঝরিয়ে সংসার চালায়, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকে। ঝলসানো ইস্পাত। ঢাক ঢাক গুড়গুড় নেই। কাউকে তোয়াক্কা করে না। পিসিকে দেখেই, আমার কান্না পেয়েছিলো। তাড়িয়ে দেওয়ার পর বাড়ি থেকে প্রথম কেউ এলো। ঘরে ঢুকেই পিসি নিচু হয়ে কড়া নজরে নাতিকে উল্টেপাল্টে জরিপ করছিলো। নাতিও তীরের বেগে সু সু করে দিয়েছে ঊর্দ্ধমুখে, সত্যসন্ধানী পিসিঠাম্মার নাক চোখ ভাসিয়ে দিয়েছে হিসিতে। পেচ্ছাব মাখার খুশিতেই পিসিঠাম্মা নাতিকে কোলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো- নাম কী রেখেছিস? 

রূপা বললো- কিং। 

আমি বললাম- কিং কিং। কিং অফ দি কিং। 

পিসি হিসেব কষে দেখিয়ে দিলো, আমরা হরিদ্বারে থাকতে ছেলে পেটে এসেছে। – ওসব আজেবাজে নাম রাখা চলবে না, এর নাম হবে হরি।  হরিধন। সাধনের ছেলে হরিধন দাস।    

যাওয়ার সময় বলে গেলো- সাবধান, তোদের পিছনে শত্রু লেগেছে। 

বাড়ি ফিরে পিসি বাবাকে রিপোর্ট দিলো- যা নোংরা কাজ করতে গিয়েছিলাম, শালার নাতি আমার মুখে মুতে দিয়েছে। 

মা বললো- ঠিক করেছে। বাড়ি থাকলে এ্যদ্দিন আমার মুখে কতোবার করতো।  

পিসি রেগে মায়ের দিকে তাকালো। খুশিতে মায়ের মুখে মুচকি হাসি। 

মেজোকাকিমার মুখের দিকে তাকিয়ে পিসি বললো – ছিঃ, অমন লক্ষ্মীমন্ত বৌকে কেউ অবিশ্বাস করে! 

মেজোকাকা গতিক বুঝে বাইরেই আসেনি। পিসি বাবার দিকে ফিরে বললো- কী বলে অমন লক্ষ্মীমন্ত বৌ বাড়ি থেকে তাড়ালি? না দেখলে বড়দা, বিশ্বাস করবিনে, ছোঁড়া দেখতে অবিকল তোর মতো হয়েছে।  খাড়া নাক। মাথায় ঘন কোঁকড়া চুল, বুকের হাড়পাঁজরা, খাঁচা ঠিক তোর মতো লম্বাটে, পা বেঁটে। 

বাবা কেঁদে ফেললেন- তোর মুখে না রে, মুতে দিয়েছে আমার মুখে। আমার নোংরামি তোর মুখে ধুয়ে দিয়েছে। বংশের প্রদীপ বলে কথা! দীপ্তি (ছোটোবোন), ছায়া (মেজোকাকার ছোটো মেয়ে), যা গিয়ে ওদের নিয়ে আয়। ঘর আলো হোক। 

10