কুলিক রোববার: স্মৃতি ৬৫

সাধন দাস

ভালোবাসার আলো 

নিচে টয়লেট, রান্নাঘর; শোয়ারঘর দোতলায়। পাশে সিঁড়ি। মুছে মুছে মসৃন। দোতলার বাসিন্দা সন্তানসম্ভবা হলেও ওঠা নামা করতে বাধ্য হয়। নিচতলার নিরীহ নাইলন শাড়িখানা হঠাৎ হঠাৎ পড়ে থাকে সিঁড়িতে। শাড়িখানা যখন নিঃসন্তান নারীর পরনে থাকে, মাতৃহীনতার যন্ত্রণা কতোখানি হিংস্র হতে পারে আপাত দৃষ্টিতে তার কিছুই বোঝা যায় না। 

গোবরডাঙা কালিতলায় আশিসদার বাড়ি ভাড়া থাকি। বাড়ি থেকে খেদিয়ে দিয়েছে শুনে অসিত (বরণ বিশ্বাস,) এসেছিলো খোঁজ নিতে। অসিত স্কুল থেকে সুখ দুঃখের বন্ধু। একই ব্যাংকে কাজ করি। ও প্রেম করেছিলো ছবির সাথে। বিয়ের সময় ওর বাবা বলেছিলেন, মেয়েকে কেউ পিঁড়িতে তুলে ঘোরাবে না। বর নিজে পছন্দ করেছে। মেয়ে সাতপাক হেঁটে নিজেই স্বামীকে বাঁধুক। আমাদের বিয়ে কাহিনি পড়েছেন। তখন আমাদের মতো প্রেমিক প্রেমিকাদের বিয়ে এ ভাবেই করতে হতো!  

পাঁচটা বেজে গেছে দেখে অসিত সরাসরি বাড়িতে গিয়েছিলো। দ্যাখে, রূপা ঘরে একা। পেটের ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছে। অসিত এসে অফিসে খবর দিলো। আমার চোখমুখে অন্ধকার। হাতের কলম থেমে গেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে বসের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালাম। বস মানে তুলসিদা বললেন, ভয় কীরে, আছি তো! সঙ্গে সঙ্গে ফোনে এ্যামব্যাসাডর বুক করলেন। খবর দিলেন রমেশদাকে। হাবড়া হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। গাড়ি আসতে আধঘন্টা দেরি। গুছিয়ে নিতে হবে। ছুটে বাড়ি এলাম। গলিতে ঢোকার মুখে ভজা ভ্যানরিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে। 

– কীরে ভজা? 

– বৌদিকে গুছিয়ে তাড়াতাড়ি আনুন। ভাইপো হবে। গৈপুর হাসপাতালে নিয়ে যাবো। 

বাড়ির সামনে একঝাঁক মহিলার ভীড়। পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ব্যথা বাড়তে বাড়তে অসহ্য যন্ত্রণা শরীর কুঁকড়ে গেছে। সহ্য করতে না পেরে রূপা সেই অবস্থায় গিয়ে ঘরের লাগোয়া ছাদের কার্ণিসে ঝুঁকে পাশের বাড়ির বৃদ্ধা মাসিমাকে ডাকে। ভর দুপুর। ভাতঘুমে বেহুঁশ পাড়া। বে-লাগাম যন্ত্রণায়, শরীরের অস্বাভাবিক ভারে ভাগ্যিস পড়ে যায়নি! রূপার মনের জোর অসাধারণ। মাসিমা বুঝতে পারলেন প্রসব যন্ত্রণা। বৃদ্ধা যাঁর বাড়ির বাইরে যাওয়ার বয়স পেরিয়ে গেছে, তিনি তিনপায়ে হেঁটে খবর দিতে গেলেন দশ মিনিট দূরের বাড়ি আর এক বৃদ্ধাকে। তিনি এককালে বাচ্চা প্রসব করাতেন। বৃদ্ধাদের আসা যাওয়ার সময়ও কম নয়। দাঁতে দাঁত চাপা অন্ধকারের আতঙ্কে সূর্য ওঠার এক অসম্ভব প্রতীক্ষায় ছিলো রূপা। ধাইমা এসে দেখেন, বাচ্চা প্রসব হয়ে গেছে। ফুল পড়েনি। ঊনিশ বছরের একা এক ডাকাত মেয়ে সেই অবস্থায় উঠে গিয়ে ব্লেড নিয়ে এসেছে। কিছুই জানে না। প্রথম সন্তানের নাড়ী কাটার চেষ্টা করছে। কী সাংঘাতিক! 

ঘরে ঢুকলাম, ছাদের গায়ে একটা হলুদ বাল্ব জ্বলছে। আটমাসের হাড় জিরজিরে অপুষ্ট আমার ছেলে। মায়ের কোলে। গোল্লাগোল্লা চোখ। প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। চোখের ভিতরে আরো দুটো বাল্ব জ্বলছে। পলক পড়ছে না। বদমাস! আহা, খোকার আমার চোখদুটোই সম্বল। মায়ের বুকে একটু দুধ টানছে একটু হাঁপিয়ে নিচ্ছে। এতো রোগা, এতো রোগা, ঝুঁকে স্পষ্ট দেখলাম, পাতলা ফর্সা চামড়ার ভিতর দিয়ে সাদা রঙের দুধ গলা দিয়ে নেমে যাচ্ছে। মুখ তুলে রূপার দিকে তাকালাম। রূপা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েই আছে। চোখদুটো বিস্ময়ে আবেগ-বিস্ফারিত। আপ্লুত অশ্রুতে সেখানে আরো দুটো ভালোবাসার আলো ঝকঝক করে জ্বলছে। যেনো বলছে, আমি পেরেছি। 

22