কুলিক রোববার: সাহিত্য প্রসঙ্গ : পর্ব ৩

ভাস্কর চৌধুরী

হুমায়ুন আহমেদ ও তাঁর “এইসব দিনরাত্রি” লিখা ও প্রকাশের নেপথ্য ঘটনা

—  ———–   ———— – ————–

 ১৯৮৫ সালের দিকে “অনিন্দ্য” নামে একটি পত্রিকা বের হতো একক উদ্যোগে। তরুণ 8 সম্পাদক শিবলী। খুব মাখামাখি পরিচয় হয়ে গেলো। শিবলী পত্রিকাটি একা করলেও , তখন লুৎফুর রহমান রিটন ও আমিরুল ইসলাম তাকে বেশ সাহায্য করতো।  ১৯৮৬ সালের একদিন জানুয়ারি মাসের প্রথমে শিবলী বললো, অনিন্দ্য নামে একটি প্রকাশনী এ বছর নতুন বই বের করবে। হুমায়ুন আহমেদ এর “এইসব দিনরাত্রি” জনপ্রিয় নাটক সিরিজটি তিনি উপন্যাস আকারে বের করবেন। এ ছাড়া কবি হেলাল হাফিজ তাঁর প্রথম কবিতার বই বের করতেন। আপনিও পাণ্ডুলিপি দিন । কবি বেলাল চৌধুরী অনুমোদন দিলেই আপনার কবিতার বই বের হবে। আমি কথাটা বেলাল ভাইকে বললাম। তিনি ভারত বিচিত্রার সম্পাদক ছিলেন। তিনি বললেন, ওরে পাগল, পাণ্ডুলিপি তুমি আমার হাতে দাও। তোমার অনেক কবিতা তো আমিই ছেপেছি। পড়া আছে। ওটা নাজমুলকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। 

 ‎ আরম্ভ হলো অনিন্দ্য অফিসে যাওয়া। প্রকাশক নাজমুল আমাদের বয়েসী। তাদের কোম্পানি “ন্যাশনাল টাইপ ফাউন্টারিজ” লাইনো ও মনো টাইপ বানায়। তা ছাড়া হ্যান্ড কম্পোজের টাইপও বানাই। প্রেসটাই অফিস।

 ‎  কম্পোজ হতে আরম্ভ করলে প্রথমে হুমায়ুন আহমেদ ও আমার কম্পোজ হয় । ফলে রোজ দুপুরে আমাকে নবাবপুর রোডের রথখোলা মোড়ে যেতে হয়। গিয়ে আমি প্রথম হুমায়ুন আহমেদের মুখোমুখি হই। তিনি বললেন, আপনি তো হাসান আজিজুল হক এর শিষ্য। গল্প ছাপুন। প্রচুর ভালো গল্প আছে আপনার। আমি বললাম, ওগুলো ১৯৮৪ সালে বই হয়ে গেছে। হুমায়ুন ভাই এর বই ছিলো অনেক বড়। তিনি বললেন, নাজমুল আমার কিন্তু ভিসিআর নেই। বই করলে একটা ভিসিআর চাই। নাজমুল ভাই তাতেই রাজি। প্রথম অংশ ছাপা হচ্ছে। দ্বিতীয় অংশে নাজমুল বললো, সেকেন্ড পার্ট করলে, সুবারু গাড়ি দেবো। ব্যাস । আমরা এইভাবে একটি পরিবার হয়ে গেলাম। রোজ দুপুরের খাবার আগে প্রেস যেতে হয়। কিছু প্রুফ দেখে আমি ও হুমায়ুন ভাই এক রিকশায় ধোলাই পাড়ে খেতে যাই। নিয়মিত মুরগি পোলাও। এ ছাড়া ওই নবাবী এলাকায় খাবার নেই। রোজ খেতে গেলে আমাদের নৈকট্য বাড়ে। তিনি রিকশা ভাড়া ও খাবার বিল রোজ দেন। আমি বলি, আমিও তো কামাই করি। আমি দিলে অসুবিধা কোথায়? তিনি বললেন , শুনুন ভাস্কর , বড় কষ্টের কথা এই যে, আমি যখন ছাত্র ছিলাম বা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মাস্টারিতে ঢুকেছি, বিয়েও করেছি, তখন গ্রাম থেকে অনেক লোক হলে আসতো। তারা অনেকেই পয়সাওয়ালা লোক ছিলো। খেতে গেলে, বা নিউমার্কেট গেলে দেখতাম, তারা খাবার পর হাত মুছে সরে যেতেন। রিকশা ছেড়ে সরে যেতেন। আমার পকেট তখন প্রায় শূন্য। ফলে খাবার বাকি পড়তো। রিকসাভাড়া দিতে পকেট খালি। সেই সব দুঃখ কষ্টের কথা খুব মনে পড়ে। আজ আমার টাকা আছে অথচ বিল নিয়ে আপনি ঝগড়া করছেন, আমি বলে রাখি, আমরা এখানে যতদিন কাজ করবো, আমিই বিল দেব। এ হচ্ছে, এক মানসিক অভিঘাতে ফল। আপনাকে মানতে হবে। আমি সেটা মেনে নিয়ে কাজ করছিলাম। তিনি পুরানো পল্টন লাইনে থাকতেন । আমি মোহাম্মদপুরে। মাজগে মাঝে বইটি সম্পন্ন করার জন্যে নাজমুল একটি ঘরে তাঁকে নিরিবিলি বসিয়ে দিতেন। হুমায়ুন আহমেদের লিখতে বসার স্টাইল অদ্ভুত। তিনি মেঝেতে বসে একটা তুলের উপর ফুলস্কেপ কাগজে মার্জিন করে একটানে মুক্তোর মতো শব্দে লিখে যেতেন। সারা পাতায় কাটার চিহ্ন নেই। হয়তো দু এক পাতার পর দুয়েকটি শব্দ কাটা । সেটি প্রেসে চলে যেতো।

 লিখার এক পর্যায়ে তিনি কয়েকবার জিজ্ঞেস করলেন, ভাস্কর , উপন্যাস অনেকদিন লিখি নি। এটি ঠিকমতো হচ্ছে তো। আমি বললাম, ঠিক পথেই আপনি যাচ্ছেন। শেষ করুন। সময় কম কিন্তু। 

 ‎ এদিকে গাড়ির গল্প করতে ভালোবাসেন তিনি। বললেন, আমেরিকায় যখন ছিলাম, গাড়ি ছিল আমার। কিন্তু ড্রাইভ করতে পারতাম না। তাই বিকেলে রোজ গাড়ির লক খুলে ড্রাইভিং সিটে একঘণ্টা বসে এটা ওটা নাড়তাম। খুব শখ ছিল চালাবার। সামনে বছর নাজমুল গাড়ি দিলে ঠিক ড্রাইভ করবো। আমি আজো জানি না , জীবনে তিনি গাড়ি ড্রাইভ করেছিলেন কিনা। অদ্ভুত তাঁর কথা । তাঁর ভেতরে এক ধরণের সারল্যে ও গ্রামীনতা ছিলো।

 ‎ এদিকে কবি হেলাল হাফিজ মাঝে মাঝে দুপুরে এসে চুপচাপ প্রুফ দেখে যান। হুমায়ুন ভাই ও হেলাল হাফিজের বাড়ি নেত্রকোনা। তবু দেখলাম, হেলাল হাফিজের কারো সাথে আলাপে মন নেই। তখন তাজা শরীর।  বিশাল কাঁচা দাড়ি। গুণ দা এর মতো। 

 ‎  হুমায়ুন ভাই শেষের দিকে প্রায় ফেল করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রেস কর্মচারী ও নাজমুল ভাই এর সহযোগিতায় এক চিপা ঘরে সারাদিন বসে লিখে লিখা শেষ করে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, চলুন চা হোক। সিগারেট দরকার। আবার ধোলাই পাড়। রিকশায় তিনি বললেন, কিছু হলো তো ভাস্কর?

 ‎ অনেকদিন পর উপন্যাস লিখতে গিয়ে এমন সংশয় ছিলো তার। পরে একদিন তাঁর পল্টন লাইনের বাড়িতে গিয়ে দেখি, সন্ধ্যায় তিন মেয়ে আর গুলটেকিনকে নিয়ে কি যত্নের সাথে তিনি ভিসিআর এ সিনেমা দেখছেন। খুব ভালো লেগেছিল তাদের সুখের সংসার দেখে। বড় সুখী ছিলেন তখন।

36