কুলিক রোববার: স্মৃতি: ৬৪

সাধন দাস

কুটকুটে কম্বল 

রূপার বাবার একটা মিলিটারি কম্বল ছিলো। হাড়েশক্ত, নোংরা কালো। রোঁয়াগুলো শুয়োপোকার চেয়ে ধারালো। কাছে ঘেঁষলেই হুল ফুটে যেতো। যেদিন আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিলো, সন্ধ্যেবেলা, আমরা কোথায় আছি কেমন আছি দেখতে এসে তিনি ওটা দিয়ে গিয়েছিলেন। (অফিসের ডেভেলপমেন্ট অফিসার জীবনস্যারের ঘরে মশার কামড় ঠেকাতে ফ্যান চালিয়ে যে কম্বলটা দু’জনে জড়াজড়ি করে ঢাল বানিয়েছিলাম। সেই থেকে ওটা আমাদের বিপদের সঙ্গী) চাঁদু ওটা হুড়িমুড়ি দিয়ে শুতো। বিছানায় উঠে ডাকতো- আয় তো আমার কুটকুটে কম্বল। 

ওর পাশে নতুন লেপে শুতে লজ্জা পেতাম। আমরাও হুড়িমুড়ি দিতাম, যতোখানি শীত তারচেয়ে বেশি ছিলো লজ্জা। চাঁদু ডাকলেও সাড়া দিতাম না। ঘা গুঁতো দিলেও না। পুরণো আমলের ঘর। ফুটোফাটা দিয়ে ফুরফুর করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকতো। শীত আর লজ্জায় গল্প জমতো না। 

কম্বলটার ওয়াড় লাগাবার খরচটা বাঁচিয়েছিলাম, কম্বলের নিচে রূপার শাড়ির আস্তরণ দিয়ে। সকালে দেখতাম, শাড়ি, কম্বল, চাঁদু তিনজন তিন দিগন্তে শুয়ে আছে। কখনও শ্বেতপাথরের হাড় কনকনে ঠাণ্ডা মেঝেতে। গোল পাকাতে পাকাতে ছ’ফুট লম্বা চাঁদু কেন্নো হয়ে ঘুমুতো। আসলে ভুলের ভান করা ঘুমে আমাদের দু’জনকে একা থাকার সুযোগ করে দিতো। 

শাড়ি কম্বলের তো বিয়ে হয়নি! একা থাকা, জড়িয়ে থাকার তফাৎ বোঝে না। রূপা গরিব যৌথ পরিবারের মেয়ে। ভাই বোন মা মাসি মামা এক বিছানায় শুয়ে নিষ্পাপ বড়ো হয়েছে। হাজার বোঝালেও চাঁদুর আলাদা থাকার মানে বুঝতো না। চাঁদুদার ঠাণ্ডা মেঝেয় শোয়া নিয়ে বিস্তর অশান্তি বাঁধাতো। অগত্যা বাকিতে তোষক বালিশ চাদর কিনে আনলাম। সমস্যা মিটলো না। বাড়িওলি(আশিসদার বৌ) মাখনফর্সা বৌদি অনাত্মীয় ইয়ংদাদার সাথে একঘরে, এক বিছানায় শোয়া সন্দেহের চোখে দেখলেন। ব্যাঁকা ইংগিতময় মিষ্টি কথায় বুঝিয়েও দিলেন। রূপাও বৌদিকে সোজা কথা সাপ্টা করে বুঝিয়ে দিলো, ভাই বোন দাদা মিলেমিশে বড়ো না হলে মন নোংরাই হয়। বৌদির সাথে রূপার বাইরে ভাব থাকলেও মনের ভিতরে কষ্টের সম্পর্ক শুরু হয়ে গেল। রূপা সরল মেয়ে, কথাগুলো সারাদিন ওকে কষ্ট দিয়েছে। রাতে নিচতলার রান্নাঘরে তিনজন খেতে বসেছি, রূপার মুখ নিচু, বৌদির ব্যাঁকা কথাগুলো বলছিলো, আর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরছে। দরজার ফাঁক দিয়ে আমি আর চাঁদু দেখলাম, আশিসবৌদি কলপাড়ের আড়াল থেকে শুনছে। 

চাঁদু বললো- আসলে তো কুটকুটে কম্বল। বাহারি শাড়ি দিয়ে যতোই মোড়াস গায়ে কাঁটা ফুটবেই। 

বললাম- মোটা মার্কিন কাপড়ের ওয়াড় করতে দিয়েছি। মাখন রঙা। 

রূপা কান্না মেশানো হাসিতে বললো- ঘেন্না ধরানো কালো রঙ তো ঢাকা পড়বে! 

কলপাড়কে আমাদের কথা শোনাতে পেরে আমরা তিনজন খুব হেসে উঠলাম। 

31