কুলিক রোববার: সাহিত্য প্রসঙ্গ: পর্ব ২

ভাস্কর চৌধুরী

স্বাপ্নিক ও লেখক হুমায়ুন আহমেদ

————————————– ————-

    যখন হুমায়ুন আহমেদ সহজ সরল জীবনযাপন করতেন, হাতে বাড়তি কিছু টাকা আসতে আরম্ভ করেছিলো, কিন্তু বড় কিছু করার মতো টাকা হয়নি তাঁর, তখন তিনি সেই ১৯৮৭ সালে স্বপ্নের কথা বলতেন। অদ্ভুত সব স্বপ্ন তাঁর। বলতেন, এই চাকুরী ছেড়ে দিয়ে গ্রামে একটা এতিমখানা করবো। আমি গুলতেকিন আর পরিবারের সবাই একটা সুন্দর চালা ঘরের স্কুল করবো, মনে ধরুন রবীন্দ্রনাথের মতো একটা বোলপুর চাই আমার। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবো। স্কুলে প্রকৃতির মাঝে বাচ্চাদের গড়ে তুলব।

    ‎আমার লিখার আয়ের টাকা থেকে খরচ চলবে। আমি ঐখানে একটা মাটির ঘরে টিনের চালা দিয়ে ঘর করবো। চালার নীচে বসে বৃষ্টি দেখবো। রাতে জোস্নায় একাকী হাঁটবো। কি বলেন? 

    ‎  তিনি গাড়ির চেয়ে রিকশায় ঘুরতে খুব পছন্দ করতেন। শাহবাগ রোড, হয়ে আজিজ মার্কেটের সামনে দিয়ে কাটাবনের পথ দিয়ে ভার্সিটি পর্যন্ত ঘুরতেন। আবার কোনোদিন অন্য পথে যেতেন। মেডিক্যাল কলেজের পাশে পপুলারে খেতে চাইতেন।

    ‎আমি বুঝে নিতাম তিনি এমন গল্পের ছক আঁকছেন। পরে দেখেছি, তিনি সেসব থেকে কিছু নিয়ে মধ্যবিত্তের চিন্তা ও পরাজয় নিয়ে উপন্যাস লিখছেন। সেসব দেদার বিক্রি হচ্ছে। 

    ‎ একদিন তিনি বললেন, পৃথিবীতে সব কিছুর মূলে একটি করুন সুর আছে। খুব ধীরে বয়ে যায়। হালকা বাতাসে বয়ে যায়। আমি বললাম, পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির আগে সুরের সৃষ্টি হয়েছিলো। জোস্না ও রোদের সৃষ্টি হয়েছিল। জল ও বাতাসের সৃষ্টি হয়েছিলো। বৃক্ষবন হয়েছিলো। পাতার মর্মর ধ্বনি বেজেছিলো আগে। জল ও বাতাসে জলতরঙ্গ বেজেছিলো। তারপর মানুষ আসে। তাই মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারে। হুমায়ুন ভাই চুপ করে শুনে বললেন, দারুন কল্পনাশক্তি আপনার। আমি বললাম, আমি একটি বোবা বউ এর স্বপ্ন দেখি। হুইল চেয়ারে বসে থাকবে। কিন্তু খুব নিটোল চোখ হবে তার। আমি তার সেবা করবো। আদর করবো। নিজে খাওয়াবো। দ্বপ্নটা ক্যামন? তিনি বললেন, ও রকম নয়। আপনি মানুষের মাঝারি সুখ দুঃখ ও কিছু অদ্ভুত জীবন নিয়ে ভাবতে পারেন। নদী আছে। আমি ভাবি নদীতে কিছু মানুষ দীর্ঘদিন বউ বাচ্চা নিয়ে বা ছেড়ে থাকে। পাল উড়িয়ে বহুদূর যায়। রান্না করে আর খেয়ে ঘুম যায় কেউ। আর কেউ নৌকার হাল ধরে। বা ধরুন কেউ একটি ঘাটের দুঃখি মেয়েকে বউ বানিয়ে বহুদিন নৌকায় কাটিয়ে দেয়। কিভাবে এটি সম্ভব? অথচ এরকম জীবনযাপন বহুকাল ধরে চলে আসছে। এর মাঝে কষ্ট ও রোমান্স আছে। বাংলার রূপ আছে । স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে । 

    ‎ এসব বললে ঘোর বাড়ে। আমরা আবার সুরকল্লোল এর ক্যাসেট এর দোকানে ঢুকি। আমি শাহনাজ রহমতুল্লহ এর একটা গজল খুঁজি। আর তিনি বয়াতি ,  মরমী গানের খোঁজ করেন। খুব সফট হৃদয় তাঁর।

    ‎ এমন স্বপ্নদ্রষ্টা হুমায়ুন আহমেদ আসলে আপামর বাংলার মানুষের সহজ আত্মিক বোধ ও কিছু অপূরণীয় স্বপ্নের জাল তৈরি করেছিলেন। সেই সব বোধকে তিনি তাঁর লিখার কাঁচা মসলা হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছিলেন। 

    ‎ আর যারা হুমায়ুন আহমেদের বাস্তব জীবনে ও লিখার সাথে পরিচিত তারা ঠিক টের পাবেন, লেখক হুমায়ুন আহমেদ চিরকাল মানুষের অদ্ভুত মুদ্রাদোষ, ও অপুরিত স্বপ্ন নিয়েই সেরা উপন্যাস গুলো লিখেছেন। তাঁর চিন্তা জলে স্থলে , বৃক্ষবনে ও মানুষের চেতনার গভীরে ভ্রমণ করতো । আর তিনি যেমন তাঁর উপন্যাসে সেগুলো ব্যবহার করেছেন, তেমনি তিনি নুহাশ পল্লীও গড়ে তুলেছেন। 

    ‎ অদ্ভুত তাঁর চিন্তা ও লেখনিশক্তি। যা চিরকালীন নয় । ঘোর লাগা ভাব রেখেই তিনি তাঁর নাটক ছায়াছবি ও ব্যক্তিজীবনে সব ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন।

    ‎ 

পরের কাহিনী পরে লিখা যাবে।

33