কুলিক রোববার : ঘরের কাছে আর এক ঘর

শৌভিক রায়

পর্ব ৭

ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরাঘুরির সুবাদে দেশের বেশ কিছু নামী মসজিদ দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে। তাদের গাম্ভীর্য, বিশালত্ব, স্থাপত্য দেখেছি আর বিস্মিত হয়েছি। কিন্তু ঘরের কাছে আর এক ঘরে, এরকম একটি বিরাট ব্যাপার থাকতে পারে, সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না।

চড়া রোদ আজ। গৌড়বঙ্গের দাবদাহ বেশ টের পাচ্ছি। এত রোদে আমরা, যারা রাজ্যের আরও একটু উত্তরে থাকি, একটু অসুবিধেয় পড়ি আর কি। কিন্তু দামাস্কাসের আট শতকের জুম্মা মসজিদের অনুকরণে তৈরি আদিনা মসজিদটি দেখে সে অসুবিধে নিমেষে গায়েব হল। ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকন্দর শাহ এই মসজিদটি নির্মাণ শুরু করেন ১৩৪৭ সালে। তাঁর পুত্র গিয়াসউদ্দিন আজমের আমলে ১৩৬০ সালে (মতান্তরে ১৭৭৩ সাল) সেই নির্মাণ সমাপ্ত হয়। বাংলাদেশের ন্যাশনাল এনসাইক্লোপিডিয়া বলছে, For a sultan like Sikandar Shah, who declared himself to be the ‘most perfect of the sultans of Arabia and Persia’ in 1369 AD, and eventually the khalifa of the faithful, the building of such a mosque was a natural manifestation of his power and wealth. Needless to say, a sultan who could compare himself with the Khalifas of Damascus, Baghdad, Cordova or Cairo could also erect a mosque comparable in size and grandeur to the great mosques of those capitals. It is curious that the Adina Mosque compares with the mosques of those cities not only in size, but also in plan and standardisation; in fact, it rivals the masterpieces of the world. A mosque, described as ‘standard’, requires a vast rectangular plan with an open courtyard (sahn) surrounded by cloisters (riwaqs) on three sides and the prayer chamber (zullah) towards the qibla. The Adina Mosque conforms to all these principles, and hence is a standard type of mosque.

বিতর্ক কিন্তু কখনই আদিনা মসজিদের পিছু ছাড়েনি। নামকরণের ব্যাপারটিই ধরা যাক। ফারসি ভাষায় ‘আদিনা’ অর্থ জুমা বার বা নামাজ পড়ার দিন। কেউ কেউ বলেন, পবিত্র মদিনার সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে মসজিদের নাম রাখা হয়েছিল আদিনা। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক অন্যত্র। হিন্দুরাজা গণেশের দেবতা আদিনাথ শিবের থেকে এই নামটি এসেছে বলে বিশ্বাস বহুজনের। উড়িয়ে দেওয়া যায় না সেই মত। কেননা মসজিদের গায়ে, উপাসনা বেদির সর্বোচ্চ সোপানে রয়েছে হিন্দু দেবদেবী ও অন্যান্য স্থাপত্য। রয়েছে বৌদ্ধ ও জৈন স্থাপত্যও। আদিনাথ থেকে আদিনা শব্দটির উদ্ভবের কারণ তাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতিহাসবিদ গবেষক ডঃ সুস্মিতা সোম লিখছেন, সুলতান ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ এই মসজিদটির নির্মাতা বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। যদিও এটির প্রকৃত স্থাপত্যকাল এবং প্রকৃতপক্ষে এটি কী ছিল সেই বিষয়ে ঐতিহাসিক গবেষকদের অনুসন্ধিৎসা কৌতূহল এবং বিতর্কের অবসান হয়নি আজও … শোনা যায় আদিতে এটি জৈন পথপ্রদর্শক আদিনাথের মন্দির ছিল। পরে পরিণত হয় বৌদ্ধ বিহারে। কেউ বলেছেন এখানে একটি বিশাল মন্দির তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৮৮৭-৮৮ সালে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ বেঙ্গল’ রিপোর্টে জে ডি বেগলার বলেছিলেন, ‘The sanctum of the temple, judging from the remnants of heavy pedestals of statues, now built into the pulpit and the superb canopied trefoil now doing the duty of prayer niche stood where the main prayer nich now stands : nothing world probably so tickle the fancy of a bigot (?) as the power of placing the sanctum of his orthobox cult (in this case the main prayer niche) on the spot where hated infidel had his sanctum.’ অর্থাৎ আদিনা মসজিদ অন্য কোনও ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তিনি নিজে স্বয়ং আদিনা মসজিদের চত্বরে ৫-৬ ফুট গভীরে খনন করেও, কোনও ভিত্তিভূমি পাননি। আবার কোনও কোনও ঐতিহাসিক গৌড়ের মন্দির ও প্রাসাদ ভেঙে আদিনা মসজিদের জন্য উপকরণ আনা হয়েছিল ভাবলেও, এই বিষয়ে প্রামাণ্য কোন নথি নেই।

কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল ইত্যাদি সবই অতীত আজ। উত্তর খুঁজতে যাওয়াও বৃথা। তার চাইতে বরং দেখে নিই মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনন্য এই নিদর্শনটিকে। মসজিদে মোট স্তম্ভের সংখ্যা ৪০০। গম্বুজ রয়েছে ৩৭০টি। মসজিদের আয়তন ৫০৭ x ২৮৫ ফুট। একশ সাতাশটি সমভূজে বিভক্ত মসজিদে বারো হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারেন। বাদশাহ কা তখত রাখা আছে ৮ ফুট উঁচুতে রথাকৃতি কালো বেদিতে। পশ্চিম দরজা দিয়ে ঢুকে দেখা যায় সিকান্দার শাহের সমাধি। তবে এই বিষয়েও বিতর্ক আছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, এর সহজ যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ হলো প্রকোষ্ঠের মধ্য দিয়ে বিরাট প্রস্তর স্তম্ভের অবস্থান এবং শবাধারটির অবস্থান প্রকোষ্ঠের মধ্যবর্তী স্থানে নয়, মেঝের পশ্চিম প্রান্তে। বাদশাহদের কবর সাধারণত এক গম্বুজ বিশিষ্ট দালানে হয়ে থাকে এবং শাসকের দেহটি থাকে প্রকোষ্ঠের মাঝখানে এবং গম্বুজটি তার উপরে স্বর্গীয় খিলান ছাদের (vault) নিদর্শন। আজকের আদিনা মসজিদ এক খন্ডহর যেন! পার্থক্য, সেই ধ্বংসাবশেষকে সাজিয়ে গুজিয়ে রাখা হয়েছে। বিশ্বাস করা কঠিন এক সময় এই মসজিদটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম। এটি সিরিয়ার উমাইয়া মসজিদের আদলে নির্মিত মসজিদে এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে অতীতের নানা চিহ্ন।

আদিনা মসজিদ থেকে চলে আসি একলাখি মসজিদে। হিন্দুরাজা যদু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জালালউদ্দিন মহম্মদ শাহ নাম নিয়ে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। নির্মাণকালে এর ব্যয় হয়েছিল লক্ষ টাকা। ফলে নাম হয় একলাখি। টেরাকোটা শোভিত এই দুরন্ত মসজিদটিকে অবশ্য অনেকে একলক্ষীও বলে থাকেন। মসজিদে শায়িত স্বয়ং জালালউদ্দিন, বেগম আসমানতারা ও সন্তান আহমেদ। খুব কাছেই দশ ডোমের কুতুবশাহী মসজিদ। সূর্যের আলোয় স্বর্ণাভ দেখাতো বলে ছোট সোনা মসজিদ নামেও পরিচিত এই অপূর্ব স্থাপত্য। বড়ি দরগা, সালামি দরওয়াজা, ছোটি দরগা ইত্যাদিও পাণ্ডুয়া-আদিনার অন্যতম দ্রষ্টব্য। প্রত্যেকেই নিজেদের ঐতিহ্য ও অতীত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সব বৈপরীত্যের বিরুদ্ধে। বড়ি দরগায় দেখা যায় ফকির সৈয়দ শাহের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী। অপর সিদ্ধ পীর নুর-কুতুব-আলমের স্মৃতি বিজড়িত মাজার ছোটি দরগাটিও বেশ সুন্দর। তবে ঢুকতে পারলাম না খানিক দূরের ডিয়ার পার্কে। ফলে দেখা হল না সিকন্দর শাহের ২৭ ঘরের ধ্বংসস্তূপ `সাতাশঘরা’।

তাতে অবশ্য খুব কিছু কষ্ট হল না। কেননা সুলতানের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ না দেখে চলে গেলাম গ্রামের মাটির বাড়িতে। দুপুর তখন। প্রখর রোদের সেই দুপুরে মাটির বাড়ির স্নিগ্ধ ছায়া মুহূর্তেই টাটকা করে দিল মনকে। কী সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িগুলি। আমাদের এদিকে একদা টিনের বাড়ির জায়গা পাকা দালান বাড়ি দখল করলেও কিংবা খোদ মালদায় ফ্ল্যাটবাড়ি অতীতকে পরাজিত করলেও, এই গ্রামগুলিতে এখনও সাবেকিয়ানার স্পর্শ। কোচবিহার থেকে এসেছি শুনে তারা পিঁড়ি দিলেন বসতে, চা-সরবতে আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে বললেন। সবিনয়ে তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে দিতে ভাবছিলাম, এখনও আতিথেয়তা মুছে যায়নি। তাই অজানা অচেনা পরদেশীর জন্যও গ্রামবাংলায় অপেক্ষা করে ভালবাসা।

ঘরের কাছে আর এক ঘরের এই ছোট্ট পথে, মালদা রামকৃষ্ণ মিশন থেকে সোজা চললাম জহরা কালীবাড়িতে। শহর থেকে পাঁচ/সাত কিমি দূরের এই মন্দির অত্যন্ত বিখ্যাত। মন্দির গাত্রে উল্লিখিত, ১২১৩ বঙ্গাব্দে এখানে শুরু হয়েছিল দেবীর পুজো। অবশ্য বল্লাল সেনের আমলে এই অঞ্চলে বেশ কিছু মন্দির প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। জহরা কালীবাড়ি সম্পর্কে কথিত, ছল্ল তিওয়ারি নামে উত্তরপ্রদেশের এক মাতৃসাধক দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে স্বপ্নাদেশে রায়পুর গ্রামের আমবাগানে দেবী জহরা চণ্ডীর বেদী স্থাপন করে। পরবর্তীকালে হীরারাম তিওয়ারি নামের অন্য এক সাধক দিব্যদর্শনে দেবীর রূপ প্রত্যক্ষ করেন। আর সেই অনুযায়ী বৈশাখ মাসে মায়ের অপ্রচলিত মূর্তির রূপরেখা তৈরি করেন। লাল রঙের ঢিবির ওপর রয়েছে এক মুখোশ। ঢিবির দু’পাশে আরও দু’টি মুখোশ দেখা যায়। এছাড়া গর্ভগৃহে আছে শিব আর গণেশের মূর্তি। বৈশাখ মাসে দেবী জহরার পুজো এভাবেই প্রচলিত হয়। অতীতে ডাকাতদের পুজো পেতেন মা। আর আজ ভক্ত সমাগমে একদা নির্জন গ্রাম গমগম করে। তবে পুজো হয় দিনে। মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তির নাম এসেছে `জহর’ থেকে।

শেষ হল ঘরের কাছে আর এক ঘরের বৃত্তান্ত। এবার ফেরা অন্য ঘরে। সে ঘর আসলে নামেই নিজের। আসলে নিজের বলে তো নির্দিষ্ট কিছু হয় না। সবই নিজের। শুধু ধরতে পারলেই হল! ধরতে পারি না বলেই আমার আমার করি। আর সেই করাতেই মুছে যায় কত স্মৃতি, কত প্রেম, কত কথকতা। দিনের শেষে শুধু দেখি, লোকসানের ঘরেই জমল সব। কিন্তু লাভের পাল্লা যে আরও ভারী বুঝলাম না তা!

(সমাপ্ত)

40