জলঘরের যাদব বাইন অবসরে হস্তশিল্পেই খোঁজেন আনন্দ

ওয়েবডেস্কঃ

পোস্ট অফিসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী যাদব বাইন। ছোটবেলা থেকেই মনের ভেতরে ঘুরপাক খেত শিল্প । বাতিল কাঠের টুকরো দিয়ে শিল্পরূপ দেওয়া যেন তার নেশা। বালুরঘাটের পাশেই চকভৃগু। আর চকভৃগুর কাছে জলঘরেই ঘর তাঁর। বাড়িটিও করেছেন তিনি একটি পুকুরের ধারে অনেকটা জলের উপর। সঠিক অর্থেই তাঁর বসত বাড়ি জলঘরে।

বেশ কয়েক বছর হল কর্ম জীবন থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করলেও শিল্পসমস্যা আভ! জীবনে তার অবসর নেই। এ জীবন চলছে অবলীলাক্রমে। এখন বরং আরো বেশি সময় পাচ্ছেন হস্তশিল্প চর্চার জন্য। আপাদমস্তক সহজ-সরল মানুষ যাদব বাইন। তাঁর শিল্প চর্চার মধ্যেও উঠে আসে সাধারণ মানুষের ভাবনার খোরাক। আমাদের চারিপাশে অযত্নে ও হেলাফেলায় ছড়িয়ে থাকা নানা দ্রব্য দিয়েও যে অপরূপ শিল্প তৈরি করা,যায় তা যাদব বাইনের কাজ না দেখলে বোঝার উপায় নেই।

শিল্পী যাদব বাড়িতে বসে আপন মনের খেয়ালেই ছোট ছোট কাঠের টুকরো দিয়ে অপরূপ শিল্প গড়ে তুলছেন। হস্তশিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতির গণ্ডি শহর পেরিয়ে জেলা এবং রাজ্যের বাইরেও পৌঁছে গেছে। কিভাবে শিল্পী হয়ে উঠলেন? তিনি শোনালেন তাঁর কথা। একদিন হঠাৎ করেই ছোট্ট একটি কাঠের টুকরো হাতে নিয়ে তাকে একটি শিল্প অবয়বে গড়ে তোলার ভাবনা আসে। সেই লক্ষ্যেই তা ছুরি দিয়ে কাটতে কাটতে একটা শিল্পরূপ পায়। তারপর থেকে সেই মনের খেয়াল চেপে বসে ভেতরে। কেমন যেন একটি নেশা হয়ে দাঁড়ায়। এ নেশা শিল্প করার।

সেই নেশা আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে। ছুরি, বাটালির মত সহজ আয়ুধ তাঁর যন্ত্র। নানা রকম অব্যবহৃত কাঠের টুকরো দিয়ে শিল্পসম্ভার গড়ে চলেছেন যাদব । এ যেন তাঁর মনের সংসার। কোন বিশিষ্ট কেউ তাঁর বাড়িতে গেলে, শিল্পসম্ভার দেখাতে তাঁর সে কি আনন্দ! তাঁর মনে শিল্প সুখের উল্লাস। ছোট একটা কাঠের বল থেকে শুরু করে একটি ক্রিকেট মাঠের মডেল অন্যদিকে শঙ্খ, ডাইনোসর গাছবাড়ি, তাজমহলের মত বিভিন্ন ধরনের মডেল তৈরি করেন তিনি। তিনি এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছেন রেডিও, ফাইভ ইন ওয়ান মডেলের শিল্প, ঢাল- তরোয়াল কম্পিউটার , সাপ ইত্যাদি। তবে ফাইভ ইন ওয়ান শিল্প দ্রব্যটি সকলের পছন্দ হয়। এই ফাইভ ইন ওয়ান শিল্প দ্রব্যটি মাত্র একটি মূর্তি থেকেই কখনো লেজ লাগিয়ে ইঁদুর কখনো কান লাগিয়ে খরগোশ আবার কখনোবা ক্যাঙ্গারু বা কাঠবিড়ালি হয়ে ওঠে। এর মধ্যে তিনি বাইবেল কোরান, গীতাও তৈরি করে ফেলেছেন। কাঠের পাতার উপর গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়কে রীতিমত পড়বার উপযুক্ত করে তিনি গড়েছেন। পাতলা কাঠের উপর ছোট ছোট কাঠের অক্ষরের কাজ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি ছাপানো অক্ষর কেই কাঠের পাতায় আঠা দিয়ে জুড়ে দিয়েছেন। তাঁর শিল্প সম্ভারে রয়েছে কাঠের ফ্যান। বিদ্যুৎ সংযোগ করলেই সে ফ্যান ঘুরতে থাকে। তৈরি করেছেন নাগরদোলা, ব্রেক ডান্স এর মত বেশ কিছু যন্ত্রচালিত শিল্পদ্রব্য। তাঁর তৈরি কাঠের রেডিও তো রীতিমতো যেকোন কাউকে তাক করে ধরবে।

শর্ট ওয়েভ বা মিডিয়াম ওয়েবের পাশাপাশি এরিয়েল লাগিয়ে এফএম শোনা যায় তাঁর কাঠের রেডিওতে। কাঠের তৈরি জিনিস গুলো অধিকাংশই মহুয়া, আকাশমনি কাঠের টুকরো থেকে তৈরি। শহরের কাঠের আসবাবপত্রের দোকানদাররা অপ্রয়োজনীয় ছোট ছোট কাঠের টুকরো গুলি তার জন্য এনে দেন। জানা গেল অধিকাংশ দোকানদার এর জন্য কোন অর্থ নেন না। শিল্প রসিক সংস্কৃতিজন অধ্যাপক সুকুমার বাড়ই জানান, এইরকম শিল্প পাগল মানুষ সচরাচর দেখা যায় না। যাদব বাবুর যাপিত জীবনে শিল্প হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার রসদ। আর এ কাজে তাঁর যে অনাবিল আনন্দ আসে তাতেই তিনি খুশি থাকেন।

58