কুলিক রোববার গল্প : দেখা

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

ভারতের উত্তর-পূর্বের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে চলেছি। দূরপাল্লার বাস চালাচ্ছেন বছর চল্লিশের মহিলা। ন্যাড়া পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে খাঁজ কেটে চলে গেছে রাস্তা। নিচে খাদ কালো হয়ে আছে। যেভাবে গাড়ি চলছে তাতে মনে হয় নাগরদোলায় চড়েছি। ইষ্টনাম জপার ফাঁকে একবার করুণ গলায় বললাম, একটু ধীরে চালাবে প্লিজ? বেমক্কা একটা বাঁক নিতে নিতে চালকের ছোট্ট উত্তর ভেসে এল, আই অ্যাম ইয়াওমিলা। ট্রাস্ট মি। 

পীতাভ মুখ, মঙ্গোলয়েড চোখ, শালকাঠের গুঁড়ির মতো শক্তসমর্থ চেহারার মহিলার নাম আগেই জেনেছি। বাস ছাড়ার সময় ডাকাবুকো মহিলা নিজের সিটে বসে যাত্রীদের উদ্দেশে বাজখাঁই গলায় বলেছিলেন, আমি ইয়াওমিলা। নো টেনশন। যে কোনও পুরুষ ড্রাইভারের থেকে আমি ভাল গাড়ি চালাই। 

বাসের বেশির ভাগ যাত্রী স্থানীয়। তারা নিরুত্তাপ। শুধু আমার মতো দু চারজন বাঙালি টুরিস্ট পড়েছে আতান্তরে। ক্রমাগত ডাইনে বাঁয়ে উপর নিচে করছে গাড়িটা। আমি বসেছি ড্রাইভিং সিটের ঠিক পেছনে। মনে হচ্ছে কোনও ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে পড়েছি। গা বমি বমি করছে। কাঁচুমাচু মুখে বললাম, বাসটা থামানো যাবে কোথাও? একটু স্মোক করতাম তাহলে। ইয়াওমিলা হেঁড়ে গলায় বললেন, ঠিক আধঘন্টা পর দাঁড়াব। 

একটা লেক। লেক, না কি জলাভূমি? তার ধারে বাস দাঁড়াল। গোটা গাড়িতে আর স্মোকার নেই। বাস থেকে নেমে একটা সিগারেট ধরালাম। ইয়াওমিলা আমার পাশে এসে সিগারেট চাইলেন হাত বাড়িয়ে। দুজন চুপচাপ ধোঁয়া ফুঁকছি। 

মেঘ আর কুয়াশা এক্কাদোক্কা খেলছে। টুকরো টুকরো কাচবসানো লালহলদে পুঁতির মালায় সাজানো নীলধূসর চাদর পড়ে রয়েছে চোখের সামনে। পাখি আর প্রজাপতি উড়ছে। জলটুঙির ওপর চুপটি করে এক একলা বাড়ি। নীলচে জলের ওপর কাঠের মঞ্চ তুলে তার ওপর একটা ঘর। তার চালে বসা একটা সাদারঙা পাখি। স্বচ্ছনীল জলে ডুবে ডুবে খাবার খাচ্ছে তার জুড়িদার। বাড়িটার সঙ্গে একটা শ্যাওলাসবুজ নৌকো বাঁধা।  

আমি বললাম, খুব সুন্দর জায়গাটা। কিন্তু আশেপাশে তো লোকালয় নেই। আচ্ছা ওই যে দূরের বাড়িটা, ওখানে লোক থাকে না নিশ্চয়ই? 

ইয়াওমিলা বললেন, আগে আমি ওই বাড়িটাতে থাকতাম। আমার প্রাক্তন স্বামী এখন ওই বাড়িতে থাকে তার নতুন বউয়ের সঙ্গে। তুমি স্মোক না করলেও আমি এখানে দাঁড়াতাম।

আধখাওয়া সিগারেট ফেলে দিলেন ইয়াওমিলা। আমার দিকে তাকিয়ে, না, স্বভাবজ হেঁড়ে নয় বরং নরম কুয়াশাভেজা গলায় বললেন, আসলে যতবার এ পথ দিয়ে যাই, একটু দাঁড়াই। ওই বাড়িটাকে দেখি। ওই এক কামরার বাড়ির মধ্যেই তো আটকে আছে আমার ফেলে আসা কিছু মুহূর্ত। দাঁড়াব না, বলো ?

34