কুলিক রোববার: স্মৃতি: ৬৩

সাধন দাস

রৌরব প্রেসের সূচনা   

‘বনগাঁ জীবনরতন ধর হাসপাতালের ছাদে খালি মদের বোতল গড়াগড়ি।’ শিরোনামে একটা বড়ো লেখা ‘যুগান্তর’ দৈনিকে বেরুনোর পর অমিতাভ চৌধুরী (শ্রী নিরপেক্ষ) বেকার চাঁদুকে ভরসা দিলেন, যুগান্তরে যা হোক একটা হিল্লে করে দেবেন। চাঁদু আমাদের কাছে থেকে কোলকাতা যাতায়াত করে। ফ্রিল্যাঞ্চগিরি করে বেড়ায়। 

ও বেরিয়ে গেছে। ঘরে আমরা দু’জন। অফিস যাওয়ার মুখে বুকের কাছে এসে রূপা মুখ নিচু করে বললো- কিছু খুচরো টাকা দিয়ে যাবেন?  

রূপা তখনও আপনি আজ্ঞে করে। ভুলতে পারেনি আমি মাস্টারমশায়। আগের রোববার তুলসিদার বাড়ি নেমন্তন্ন ছিলো। তুলসিবৌদি ‘আপনি আজ্ঞে’ নিয়ে খুব বাজে ইয়েমার্কা রসিকতা করেছে। রূপাকে বললাম- আগে ‘তুমি’ বলো। তারপর পাবে। 

রূপা বুকে মুখ ঘষে চিঁ চিঁ করে বললো- বেরুবার সময় চাঁদুদার হাত খরচ দিতে হয়। তুমি না দিলে কোথায় পাবো? 

বিয়ের আগের কথা, তখন আমরা চুরি করে প্রেম করি। অভাবের তীব্রতায় রূপার মায়ের মাথার গোলমাল হলে রূপা আর রূপার মাকে গোপনে বহরমপুর নিয়ে গেলাম, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হাসানকে দিয়ে চিকিৎসা করাবার জন্যে। মা আর রূপা চাঁদুদের বাড়ি থাকতো। সেই থেকে রূপা চাঁদুর বোন। অতএব আমি ভগ্নিপতি। সানন্দে পকেটে হাত ঢোকালাম। 

চাঁদুর হাত খরচের দৌলতে রূপার ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ হলাম। সেই খুশিতে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। 

একখানা নয় বাই দশ ঘর, একখানা ছয় বাই সাত খাট। তিনজনে থাকি, শুই। (চাঁদু মেঝেতে শুতে চেয়েছিলো। তেমন বিছানা বালিশ ছিলো না। হাঁড়ি কড়াই শিল নোড়া কিনে সংসার সাজাতে বিছানা কেনার সামর্থ ফুরিয়ে গেছিলো।) এক বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনজন আকাশ পাতাল গল্প করি। পৃথিবীর তিনজন মানুষের অজস্র দুঃখ, সমস্যার গল্প। চাঁদুকে অমিতাভ চৌধুরির খুব পছন্দ। এক প্যারাগ্রাফ বাংলা, ইংরিজিতে তর্জমা করার পরীক্ষা নিয়েছিলেন। এমনকি ডিকশনারি টুকলি হিসেবে সাপ্লাইও দিয়েছিলেন। তবুও চাঁদু ফেল মেরেছে। চাকরিটা হবে না। সমস্যা ভালো লাগে না। সমাধান প্রিয় আমি মাঝখানে শোয়া, হঠাৎ বলে উঠলাম- একটা ছাপাখানা খোল্‌ না কেনো? 

ডান দিকে পিছন ফিরে গোল পাকিয়ে শোয়া চাঁদু আধঘুমে বললো- মন্দ হয় না। 

বাঁ দিকে শোয়া রূপা বললো- ছাপাখানার নাম হবে রৌরব প্রেস। 

ঘুমটুম হাওয়া। চাঁদু ঠেলে উঠে বসলো। বোনের কথা ভারি পছন্দ হয়েছে। সে রাতে আমাদের ঘুম হলো না। রৌরব প্রেস রৌরব প্রেস রৌরব প্রেস। বললাম- ব্যাঙ্কে কথা বলবো। 

পরদিন কোলকাতা থেকে নাচতে নাচতে ফিরে চাঁদু বললো- তাপস ( সরখেল, ভাতৃপ্রতিম কবি)এর কাকা শ্যামল সরখেলের একটা লেদমেসিনের কারখানা আছে উল্টোডাঙায় (বর্তমানে বিধাননগর)। তার একপাশে প্রেস করার জায়গা দেবেন। আমি অফিস থেকে বেকার-লোনে ছাপাখানা খোলার স্কীম নিয়ে এসেছিলাম। সে রাতেও আমাদের ঘুম হলো না। 

36