কুলিক রোববার: সাহিত্য প্রসঙ্গ : পর্ব ১

ভাস্কর চৌধুরী

সাহিত্য সম্পর্কে হুমায়ুন আহমেদের দৃষ্টিভঙ্গি

  হুমায়ুন আহমেদ দুজন। একজন হচ্ছেন ১৯৮৮ আগের। অন্যজনের বিকাশ ও স্বরূপ ১৯৯০ সালের পরে। আমি প্রথমজনকে চিনি। আমি সেই হুমায়ুন আহমেদের কথা লিখছি। ১৯৮৭ সালে তাঁর জীবন ছিলো বড় সাধাসিধে। গুলতেকিন ও তিন মেয়ে, মা সহ ভাই বোন পরিবার নিয়ে শান্ত সংসার তাঁর। আপাতত শান্ত মনে হলেও “এইসব দিনরাত্রি” নাটকে ব্যাপক জনপ্রিয়তার সাথে এসেছিলো অনেক বন্ধুজন। কেউ খুব ভালো পরামর্শ দিতেন। যেমন ফটোগ্রাফার বন্ধু নওয়াজিশ আলী খান। অন্যদিকে ছিল কিছু ধূর্ত প্রকাশকের হাতছানি। যেমন আমার তাঁর একক প্রকাশক “অনিন্দ্য”। অনিন্দ্যর মালিক তাঁর ভেতর প্রথম লোভের বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছিলো।

   সেই সময় প্রকাশকের ডেস্কে বসে এক দুপুর বেলায় খাবার পর দুজনের একান্ত আড্ডায় তিনি মনের মুখোশ খুলে বলেছিলেন , সাহিত্য প্রসঙ্গে তাঁর ক্লিয়ার কাট মনোভাব।

    তিনি আমাকে ১৯৮৭ সালে বললেন, আপনি লিখেন এমন সাহিত্য যা সাথে সাথে মানুষের ভেতর সঞ্চারিত হয় না। বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার মিশেল থাকে। ফলে সাধারণ পাঠক টানতে ব্যর্থ হয়। জীবনানন্দ দাস বা হাসান আজিজুল হকের লিখা বুঝতে বাংলার মানুষের বহু বছর লেগেছে। সে সাহিত্য অমর হয়ে তাঁরা কি পেলেন জীবনে? কিচ্ছু পান নি। আমার স্পষ্ট কথাটি বুঝুন, মৃত্যুর পরে আমার সাহিত্যের বাজার বা সন্মান কি পেলো,সেটি আমি দেখতে ও ভোগ করতে পারবো না। ওসব লিখে আসলে লেখকের লাভ নেই। ওসব কাজে কি হয়? আমি বললাম, তাহলে কি ধরণের সাহিত্য লিখবেন আপনি? তিনি বললেন, আমি সাহিত্য হতে সব কিছু বেঁচে থাকা অবস্থায় পেতে চাই। অর্থ, জশ, প্রতিপত্তি, যা মানুষ চায়, আমি এই এক জীবনেই পেতে চাই। এ কারণে আমাকে অনেক রকম কাজ করতে হবে। অনেক মাধ্যমে কাজ করতে হবে। আমি আমার চাঁদনী রাতের স্বপ্ন, বৃষ্টিরাতের স্বপ্ন, গাড়ি , বাড়ি, ভোগের সব কিছু পেয়ে যাবো। আমি যা চাই, এই বেঁচে থাকা জীবনেই চাই। 

    এ জন্যে আপনি কোন ধরণের সাহিত্য করবেন? 

    এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন , খুব মাঝারি মধ্যবিত্তের অপুরিত স্বপ্নের কথাগুলো দিয়ে , তাদের পাওনা ও প্রাপ্যের একটি সমীকরণ মিলিয়ে লিখা লিখা উচিত। কারণ অশিক্ষিত মানুষ সাহিত্য পড়ে না। ধনীক শ্রেণীও সাহিত্য পড়ে না। সাহিত্য পরে মধ্য মানের মধ্যবিত্ত শ্রেণী। তারা উপরে ওঠার পথ পায় না। নিচের স্বপ্নও দ্যাখে না। এরাই মূলতঃ সাহিত্যের পাঠক। আপনি তাদের স্বপ্ন নিয়ে লিখুন। অপুরিত স্বপ্ন নিয়ে লিখুন। দেখবেন, আপনার পাঠক বেড়ে যাচ্ছে। “অমানুষ” ও “এইসব দিনরাত্রি” থেকেই আমি এই শিক্ষা পেয়েছি। আমি অমরত্বের জন্যে লিখবো না। আমি নগদ দিয়ে নগদ পাবার জন্যে লিখবো। আমি সুনীল হতে চাই না। আমি নিজেকে হুমায়ুন আহমেদ তৈরি করতে চাই। 

     যে যা বলুক, হুমায়ুন আহমেদের মতো এমন স্পষ্ট চিন্তার মানুষ জীবনে জীবনে খুব কম দেখেছি। সাহিত্য নিয়ে তিনি ঘন ঘন পন্ডিতের মতো বক্তৃতা মারেন নি । উচ্চ মহলে যাতায়াত করতে হয়নি তাঁকে। সাহিত্য একটি সামাজিক বাণিজ্য সেটি করে তিনি যেমন আপামর মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন , তেমনি ব্যবসা করে তাঁর জীবনের স্বপ পূরণ করেছেন। এ জন্যে তিনি অনেক কষ্ট করেছেন । নৈতিকতার ধার ধারেন নি। 

    বাংলা সাহিত্যে তাঁর এই মনোভাব ও আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি অনেক অনেক নিরীক্ষা করেছেন এবং অবশেষে তিনি তার স্বপ্ন ও ভোগের কোন স্তরে পৌঁছে গেছেন সেটি পরের কিস্তিতে লিখা যাবে।

37