কুলিক রোববার: ঘরের কাছে আরেক ঘর

শৌভিক রায়

পর্ব ছয়

বাবার মুখে শোনা সেই ঘটনার কথা মনে পড়ল। অনেকের সঙ্গে বাবাও সকরিগলিঘাটে খেতে বসেছেন। হোটেলের নিয়ম অনুযায়ী আগেই টাকা দিয়ে মাছ-ভাতের অর্ডার দিয়েছেন। হঠাৎ চিৎকার ‘স্টিমার ছাড়ছে, স্টিমার ছাড়ছে।` খাওয়া ফেলে সব্বাই ছুট। বাবাও। স্টিমারে উঠে জানা গেল তখনও স্টিমার ছেড়ে মণিহারিঘাটে যেতে ঢের দেরি। কিন্তু তখন আর হোটেলে ফিরবার উপায় নেই। ফিরলেও তারা তো আর মুখ চিনে রাখেনি। সুতরাং খাবারের আশা জলাঞ্জলি। হরিমটর খেয়েই স্টিমারে নদী পার হওয়া!

কালকূটের একটি উপন্যাসে পড়েছিলাম, এখানেই এক মহিলা তাঁর হাত ধরে অনেকটা পথ এসেছিলেন তাঁকে নিজের স্বামী বলে ভুল করে! কেননা নদী তীরের ধুলো-বালিতে কালকূট যেমন অচেনা হয়ে গিয়েছিলেন, তেমনি ঘোমটা টানা মহিলাটিও তাঁকে সেভাবে হয়ত লক্ষ্য করেননি!

ফারাক্কা ব্রিজ পার হতে হতে এসবই ভাবছিলাম। ভাগ্যিস এই ব্যারেজ আর ব্রিজটা হয়েছিল! তা না হলে বঙ্গদেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে যাতায়াত করতে এরকম কত যে ঘটনা ঘটত! আর শুধু ঘটনাই নয়, দূরত্ব আর সময়! সেও কি কম ব্যাপার নাকি?

প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, ফারাক্কা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মণিহারি আর সকরিগলির প্রসঙ্গ কেন তুললাম হঠাৎ! আসলে ফারাক্কা ব্রিজ তৈরি হওয়ার আগে বঙ্গদেশের উত্তর আর দক্ষিণের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ওই দুই জায়গা আর ওই স্টিমার। যাঁরা জিম করবেট পড়েছেন তাঁদের নিশ্চয়ই মোকামা আর সামারিয়া ঘাটের কথা মনে আছে। এই দুই ঘাটের মাধ্যমে একসময় উত্তর আর দক্ষিণ বিহারের (কিছু ক্ষেত্রে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের) যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করা হত। পরবর্তীতে রাজেন্দ্র সেতু যেমন মোকামা আর সামারিয়ার গুরুত্ব কমিয়ে দেয়, তেমনি মণিহারী আর সকরিগলিও আজ বিস্মৃত ফারাক্কার জন্য।

অবশ্য এই বিস্মৃতি হতে পারত ১৮৫০ সালে। সেই সময় ব্রিটিশরা মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কায় গঙ্গার ওপর সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রেখেছিল। কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতার পর, ১৯৬১ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ প্রোজেক্ট অথরিটি গঠিত হয়। শুরু হয় ফারাক্কা ব্যারেজের সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গিপুর ব্যারেজ, ফিডার ক্যানেল, নেভিগেশন লক ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য নির্মাণ। ব্যারেজে নির্মিত হয় ১১২টি গেট। এর মধ্যে ১০৮টি মূল গেট আর ৪টি ফিশ লক গেট। রেগুলেটর গেট রয়েছে ১১টি। এই গেটগুলি দিয়ে আনুমানিক ৪০,০০০ কিউসেক জল ফিডার ক্যানেলে ছাড়া হয়। নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তা উৎসর্গ করা হয় ১৯৭৫ সালে। ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের স্বপ্নকে সফল করেন ফারাক্কার অন্যতম স্থপতি দেবেশ মুখার্জি। গড়ে ওঠে নতুন এক ফারাক্কা, যার সৌন্দর্যে মোহিত হতে হয় সবাইকেই। এই ব্যারেজ যেমন কলকাতা বন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করছে, তেমনি ব্যারেজের জন্যই গড়ে উঠেছে ফারাক্কা সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রোজেক্ট। আর এই ব্যারেজ যে সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম সে তো বলা বাহুল্য!

ফারাক্কা ব্রিজ পেরিয়ে, খানিকটা এগিয়ে, ডান দিকে বাঁক নিয়ে, এগিয়ে চললাম। পতিতপাবনী গঙ্গা পাশে পাশে চলছে। তবে সে বিপরীতমুখী। এই বিকেলে গঙ্গার ধারে ভিড় জমেছে। তবে তা বিক্ষিপ্ত। কিছু ঘাট থেকে নৌকো আর ভটভটি চলছে গঙ্গার বুকে। এরকমই এক ঘাটে জানলাম সেই নৌকো যাবে ঝাড়খন্ডে। সময় লাগবে নাকি ঘন্টা দুয়েক। এসব দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেলাম সেই শ্মশানঘাট যেখানে রয়েছে এমন এক স্মৃতি যার বোঝা বইতে হবে সারাজীবন। থাক সে ব্যক্তিগত কথন। আরও খানিকটা এগিয়ে নজরে এলো গুমানী নদী আর গঙ্গার মিলনে সৃষ্ট নীলকুঠি থাকা দ্বীপাকার অঞ্চলটিও।

ক্রমে আলো কমে এলো। গঙ্গার ধারের বাতিস্তম্ভে ধীরে ধীরে আলো জ্বলে উঠল। কানে এলো সাঁঝবাতি শঙ্খের আওয়াজ। ফারাক্কাকে বিদায় জানাবার সময় হয়ে গেছে বুঝতে পেরে ফিরে চললাম আবার মালদায়। পরের গন্তব্য আদিনা আর পাণ্ডুয়া…. ইতিহাসের আর এক অধ্যায়কে প্রত্যক্ষ করতে।

(ক্রমশ)

51