কুলিক রোববার : মুক্তগদ্য : হোটেল কথা

ফটো : ননী গোপাল ঘোষ

মানিক দে

হোটেল কথাটি  প্রাচীন ফরাসী শব্দ হোস্টেল থেকে এসেছে।বাঙালি মননে ও জগতে হোটেল ওতপ্রোতভাবে জড়িত।বিভূতিভূষণের “আদর্শ হিন্দু হোটেল “, কল্লোল লাহিড়ীর “ইন্দুবালার ভাতের হোটেল ” ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল” হিরন্ময় হয়ে আছে  পাঠকের মনে।ক্লাস ইলেভেন থেকে জীবনের টানে টিউশন করে দু’টি শখকে যত্ন করেছি– জীবনমুখী গানের ক্যাসেট  ও হোটেলের অ্যাসেট।হোটেলে খেয়ে হেসে হেসে কতো যে মিথ্যে বলেছি!আজ সমরেশের বাড়ী,কাল দীপঙ্করের,  পরশু শুভঙ্করের তো তরশু শুভাশিসের!আজও বলি অন্যভাবে।উত্তরবঙ্গের মফস্বল শহর ও বন্দরের ভালোলাগা একঝাঁক হোটেলের হাঁক বারবার টানে।

১. করণদিঘির গোবিন্দ সাহার হোটেল ঃ-আজ থেকে প্রায় চোদ্দো বছর আগে করণদিঘি বাসস্ট্যান্ডের উল্টোদিকে  অবস্থিত ছোট্ট এই হোটেলটির একেবারেই জাঁকজমক ছিলো না ।দুপুর বারোটা থেকে বিকেল চারটের মধ্যেই আয়োজন শেষ!স্কুলের মাঝে টিফিন পিরিয়ডে খেতে গিয়েছিলাম।ঘিঞ্জি জায়গা।গোবিন্দবাবু আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে মগ্ন।বিভিন্ন মাছের ভ্যারাইটি ও রান্নার অতুলনীয় স্বাদে ক্ষনিকের জন্য বাড়িকে ভুলে থাকতাম।পরবর্তীকালে শুনেছিলাম গোবিন্দবাবু নকশাল আমলে কোলকাতা থেকে মাইগ্রেটেড হয়েছেন।জুলুদার চমৎকার ব্যবহার আজও মনে ধরে আছে। তবে, বর্তমানে হোটেলের চেহারায় খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে। 

২.প্রদীপ হোটেলঃ-

করণদিঘি থানার ঠিক উল্টোদিকে। প্রদীপদা করনদিঘি হাইস্কুলের শিক্ষাকর্মী শ্রী মন্দির দাসের দাদা।মুডি লোক কিন্তু অপূর্ব রান্না করতেন।বছর খানেক আগে গিয়েছিলাম।হোটেলটি চোখে পরেনি।

৩.লাটাগুড়ির বৌদির হোটেল :-

হোটেলটি লাটাগুড়ি বন্দরের রাজ্য সড়কের ধারে। রান্নার স্বাদ ম্যাক্সিমাম।রেট মিনিমাম। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। মেনুতে নদীয়ালি মাছের বৈচিত্র্য রয়েছে। 

৪.শিলবাড়ি ঘাটের আগে ভাঙ্গাবেড়ার হোটেলঃ–

সোনাপুর পেড়িয়ে সাহেবপোতার পরে ও শিলবাড়ি ঘাটের অাগে ভাঙ্গাবেড়া নামক স্থানে এর অবস্থান।খড়ির রান্না, মোটা চালের ভাত ও পাঁঠার মাংসের অতুলনীয় স্বাদের জন্য বারবার যেতে ইচ্ছে করে।বহু শ্রমিক মেহনতী মানুষেরা সেখানে সস্তায় পেটপুরে খেতে পারে।

৫. মালবাজারে বাপীদার হোটেল :–

লাভা- লোলেগাও, রকি আইল্যান্ড – সান্তালখোলা যাওয়ার পথে বাপীদার হোটেলের উষ্ণ ডাক ফেরানো যায় না।খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। বাটামশলার রান্না।ফ্রেশ খাবার। তবে, একটু কস্টলি।

৬.অন্নপূর্ণা হোটেল :–

মাথাভাঙ্গা শহরে বাসস্ট্যান্ড থেকে অনতিদূরে। শান্ত নিবিড় পরিবেশ। বিভিন্ন মনীষীদের লেখা  বাণী আকৃষ্ট করবে।খড়ি দিয়ে মহিলারা রান্না করেন।একদম হোমলি।পেট খারাপের কোনও সম্ভাবনা নেই।এই শহরে কোন কাজ থাকলে সহজে মিস করিনা।

৭.হোটেল শিলীঃ–

নিশিগঞ্জ বাজারে অবস্থিত। স্বামী- স্ত্রী দু’জনে হোটেল চালান।দুর্দান্ত ঘরোয়া রান্না। তবে, মিটার হাই।স্কুল থেকে ফেরার পথে অনেকদিন আচমকাই নেমে খেয়েছি।এখনো চান্স পেলে ছাড়ি না। 

৮. সিতাই- এর ঘোষ হোটেল :–

হোটেলটি সিতাই-এর বাজারে অবস্থিত। মা ও ছেলে হোটেল দেখাশোনা করেন।মূলতঃ কাকিমা রান্না করেন।হরেক পদের অসাধারণ সুস্বাদু আয়োজন মুগ্ধ করে। 

৯. বিন্দোলের শান্টুদার হোটেল :–

বি.এড করতে গিয়ে শান্টুদার হোটেলে খেয়েছিলাম। অমায়িক ব্যবহার।চিপ অ্যান্ড বেস্ট।ট্যাঙড়া মাছের ঝোল মুখে লেগে আছে। 

১০.দমনপুরে হাইরোডের ধারে নামবিহীন হোটেল :- সাম্প্রতিক হোটেলটি বেশ নাম করেছে।গরম-গরম দেশী মুরগী মাংসের ঝোলের স্বাদ মনে থাকে অনেকদিন। ডুয়ার্স ঘোরার প্ল্যান থাকলে সকাল সকাল অর্ডার দিয়ে ঘুরে এসে লাঞ্চ করবার আদর্শ জায়গা। 

এছাড়াও মাথাভাঙ্গার সিতাই মোড়ে তাপস হোটেল, গোয়ালপোখরের ধরমপুরে নানুর হোটেল, কামাক্ষাগুড়ির চক্রবর্তী হোটেল ও ময়নাগুড়ির ঝর্ণা হোটেলের নামডাক রয়েছে। 

হোটেলের ডাকে হারিয়ে যাওয়া এক অন্যরকম প্যাশন।রাঁধুনিদের দেখা যায় না।ওরা আড়ালে থেকে মনদিয়ে কাজ করে।কিছুদিন আগেও এই হোটেলগুলোতে হাহাকার ছিলো। সময়ের স্বাভাবিকতায় একটু একটু করে এরা প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। যে যা-ই বলুক দুম ক’রে বেড়িয়ে পরে এদের নিজস্ব ঘরাণার স্বাদ চেখে নেওয়া এক অনন্য অনুভূতি।

39