চিকিৎসক নিগ্রহ  বন্ধ না হলে সমাজের সমূহ বিপদ

ডা: দেবব্রত রায়

গত বছর হুগলির পান্ডুয়া রুরাল হাসপাতালের চিকিৎসক নিগৃহীত হন কর্তব্যরত অবস্থায় । অভিযোগ অত্যন্ত  গুরুতর —  বছর  ত্রিশেকের একজন যুবক হাসপাতালে বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রাথমিক লক্ষণ দেখে তাকে কিছু ওষুধ খেতে দেওয়া হয়। সেই  ওষুধ  খেয়েই নাকি তার মৃত্যু ঘটে। ভুল ওষুধ খাইয়েই  তাকে মেরে ফেলা হয়েছে এই অভিযোগ তুলে রোগীর আত্মীয়রা হাসপাতালের চিকিৎসক ডাক্তার শিবশংকর রায়কে বেদম প্রহার করেন এবং হাসপাতালে যথেচ্ছ ভাঙচুর চালায় মৃতের আত্মীয়রা। এখানেই শেষ নয়।সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরার সামনে অভিযুক্ত চিকিৎসক কে প্রকাশ্যে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এই ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।

এদেশে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মী নিগ্রহ নতুন নয়। ইতিপূর্বে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ডাক্তারকে বিষ্ঠা খাওয়ানো হয়েছে ডেবরায় । সেটাও খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয় । আড়াই বছর আগে খোদ কলকাতার এন আর এস মেডিকেল কলেজের  জুনিয়ার ডাক্তার পরিবহকে কর্তব্যরত  অবস্থাতে এমন পেটানো হয়েছিল যে তাঁর মাথায় অপারেশন করে তাঁকে বাঁচানো  হয়েছিল। এই  ঘটনা কারো অজানা নয় এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে  রাজ্য, দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহল যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল সেই সময় সবাই ভুলে গেলেও  চিকিৎসক স্বাস্থ্য কর্মীরা তা’ ভোলেননি। করোণা পর্বের শুরুতে ধারাভি কাণ্ডের কথা আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণে আছে। সম্প্রতি আসামের চিকিৎসক নিগ্রহের ভিডিও  ভাইরাল হয়েছে। রায়গঞ্জের কোভিদ হাসপাতালে গভীর রাতে  রোগীর আত্মীয় স্বজন তাণ্ডব চালিয়েছে। তালিকা আরো দীর্ঘ।

ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ভারতীয় ডাক্তারদের মধ্যে 75% কোনো না কোনো সময়ে হিংসার শিকার হয়েছেন। বিগত পনেরো বছরের মধ্যে নিগ্রহের ঘটনা ভয়ঙ্কর ভাবে বেড়ে গেছে এবং এই ব্যাপারে শীর্ষে আছে দিল্লি মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ।

যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক।  ভারতবর্ষে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে সিম্পটম নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয় কেননা এদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা এত উন্নত হয়নি বা চিকিৎসা সরঞ্জাম সর্বত্র লভ্য নয় যে প্রথম পর্যায়েই একেবারে সমস্ত পরীক্ষা করে নির্দিষ্ট চিকিৎসা শুরু করা যাবে ।সত্যি যদি তাই করতে হয় সত্যি কথা বলতে কি এমার্জেন্সি তে রোগী মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। আরো শঙ্কার জায়গা এই যে  চিকিৎসা ভুল কি সঠিক এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নিচ্ছেন রোগীর আত্মীয় স্বজন  যারা কোনভাবেই চিকিৎসাব্যবস্থার

  সঙ্গে যুক্ত নন।  এই করোনা  কালেও  তার ব্যতিক্রম হচ্ছেনা । সংবাদমাধ্যমে তার প্রতিফলন দেখা যায় সামান্যই। কারণ সংবাদমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া) টিআরপি নির্ভর। সেলিব্রেটিদের পরকীয়ার রসালো গল্প শুনিয়ে পাঠকের যত কাছাকাছি যাওয়া যায় ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর অথবা হাসপাতাল ভাংচুরের খবরে সহস্র ভাগের এক ভাগও পাঠকের কাছাকাছি পৌঁছানো যায় না।এবং সত্যি কথা বলতে কি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা সমাজে কাজের সময় কাজি কাজ ফুরলেই পাজি। সেই কারণে এঁরা নিগৃহীত  হলে সমাজের বড় অংশ ভীষণ খুশি হয়।

চিকিৎসা ভুল কি ঠিক সেকথা প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। ভুল প্রমাণিত হলে কনজিউমার প্রটেকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী আদালতে তার বিচার হতে পারে। কিন্তু কোনভাবেই  আইন হাতে নিয়ে চিকিৎসক চিকিৎসাকর্মী নিগ্রহ করার অধিকার জন্মায় না। এসব কথা মাথায় রেখেই একসময় চিকিৎসক সংগঠনগুলির চাপে 2009 সালে  পশ্চিমবঙ্গে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেয়ার সার্ভিস পার্সনস এন্ড মেডিকেয়ার  সার্ভিস ইনস্টিটিউশন ( প্রিভেনশন অফ্ ভায়োলেন্স এন্ড ড্যামেজ টু প্রোপার্টি ) নামে একটি আইন চালু হয় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য। এই আইন মোতাবেক কারা স্বাস্থ্যকর্মী,  প্রপার্টি বলতে কি বোঝায়, কারা অপরাধী বলে বিবেচিত হবেন, ভায়োলেন্স বলতে ঠিক কী বোঝায়- স্পষ্ট করে তা উল্লেখ করা আছে। আইনটিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে যে এই আইন ভঙ্গ কারীর অপরাধ প্রমাণিত হলে তিন বছর পর্যন্ত জেল এবং 50 হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। শুধু তাই নয় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নষ্ট করাহলে 1913 সালের আইন মোতাবেক এর কাছ থেকে তা’ আদায় করতে হবে।  এবং অভিযুক্ত জামিন অযোগ্য ধারায়  গ্রেফতার হবেন।

এছাড়াও গত বছরের এপ্রিল মাসে কোভিদ পরিস্থিতিতে চিকিৎসক নিগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় তড়িঘড়ি কেন্দ্রীয় সরকার 1897 সালের এপিডেমিক আইনের সংশোধিত এবং পরিমার্জিত একটি অর্ডিন্যান্স জারি করে।  অপরাধ প্রমাণিত হলে 6 মাস থেকে 7 বছর কারাদণ্ড এবং এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আদায় করার কথা বলা আছে এবং নষ্ট  সম্পত্তির দ্বিগুন পরিমাণ অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন হ’ল  আইন থাকলেও  তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি? পরিবহ কাণ্ডে অভিযুক্ত ধরা পড়েছিল প্রায় এক সপ্তাহ পর ।সেটাও তীব্র আন্দোলনের পর। পান্ডুয়া তে এখনো সব অভিযুক্ত ধরা পড়েনি অন্তত প্রশাসন তাই বলছে। তারা নাকি ফেরার!  সিসি টিভির ফুটেজ,  অন ক্যামেরা হুমকি দেওয়ার পরও যদি  অন স্পট কাউকে গ্রেফতার করা না হয় তবে  প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার পেছনে অন্য কোন গূঢ় ছায়া দেখা টা কি খুব অসঙ্গত হবে??

    বহুকাল আগে প্রবাসী বাঙালি লেখক  নীরদ সি. চৌধুরী লিখেছিলেন ‘আত্মঘাতী বাঙালি ‘।

আমরা কি তবে সেই আত্মহননের পথেই এগুচ্ছি ?!

( লেখক রায়গঞ্জ গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক)

31