কুলিক রোববার: স্মৃতি:৬২

সাধন দাস

ঢাউস বেতের ঝুড়ি 

বেকার চাঁদু (রৌরবের সম্পাদক শুভ চট্টোপাধ্যায়)। দৈনিক যুগান্তরে ফ্রিল্যান্সারের কাজ নিয়ে কোলকাতায় এসেছিলো। আমাকে খেদিয়ে দিয়েছে, না জেনেই বনগাঁর বাড়ি গিয়েছে। বাড়ি থেকে জিনিসপত্র ভর্তি বেতের একটা ঢাউস ঝুড়ি মা ওর হাত দিয়ে  পাঠিয়েছে। ঢাকনা খুলতেই, কতোগুলো জামাকাপড় বেরিয়ে পড়লো। রূপার বিয়ের শাড়িতে মোড়ানো এক গোছা শুকনো মড়মড়ে রজনীগন্ধা। খুলতেই গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। বৌভাতের দিন প্রভাতদা ( গোবরডাঙা ব্রাঞ্চের অফিসার, এক বিরল প্রেমিক, তাঁর গল্প পরে লিখবো) ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে আর বাড়িতে ফিরে আমাদের কোনো ঝামেলা হলো কিনা খবর নিতে এসেছিলেন। বাড়ির কেউ তাঁকে অপমান করে ফেরৎ পাঠিয়েছে। জোর করে ফুলের গোছাটা রেখে গেছিলেন। বাইশজন কলিগের শুভেচ্ছা জানানো বাইশখানা স্টিক। স্মৃতিগন্ধময়। নিশ্চয় বড়দি ওগুলো গুছিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। বিয়ের খবর পেয়ে একমাত্র বড়দিই এসেছিলো। বড়দিই রূপাকে বুকে জড়িয়ে ঘরে তুলেছিলো। ফুলশয্যার রাতে বড়দিই রূপাকে সাজিয়ে আমার কাছে পাঠিয়েছিলো। শয্যাও সাজিয়েছিয়েছিলো বড়দি। আর কেউ না। 

ঝড়ে পড়া রজনীগন্ধা নাকে তুলে গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করলাম। স্পষ্ট এক বে-রজনী গন্ধ পেলাম। রূপাকে বললাম- কী অপূর্ব! 

রূপা একবার শোঁকার চেষ্টা করে নাকমুখ সিঁটকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। – উঃ কী বিটকেল! 

চাঁদু মিটিমিটি হাসছিলো। তারপর ঝুড়ি থেকে বেরুলো জেভিসি টেপরেকর্ডার কাম রেডিওখানা। আমি রূপা দুজনেই গান শুনতে ভালোবাসি। হয়তো বাবা পাঠিয়েছেন! গুচ্ছের ক্যাসেটের সঙ্গে বিসমিল্লা খানের ক্যাসেটটা বেরুতেই হাতের মুঠোয় তীব্র আবেগে চেপে ধরলাম। ঠিক বাবা পাঠিয়েছেন। বৌভাতের দিন সকাল বেলা, বাড়িটা থম মেরে আছে। বাবা বলে দিয়েছেন, কোনো অনুষ্ঠান হবে না। দোতলার রাবান্দায় টেপরেকর্ডারে বিসমিল্লা খান চাপিয়ে ছিলাম। সানাইয়ের সুরে সবে বিয়ের ঘোর তৈরি হচ্ছে। একতলা থেকে অস্বাভাবিক গলায় বাবা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন- সানাই বন্ধ করো। 

ভয়ে কেঁপে উঠলাম। এতো জোরে বাবাকে কোনোদিন চেঁচাতে শুনিনি। চিৎকার নয় যেনো স্তব্ধ রাতে এক অসহায় বন্দী সিংহের ক্রুদ্ধ আর্তনাদ। সঙ্গে সঙ্গে সানাই বন্ধ করে দিলাম। বাড়িটা আরো ভয়ংকর স্তব্ধ হয়ে গেলো।

হাতের মুঠোয় বিসমিল্লা খানের ক্যাসেট। বুকের কাছে তুলে আনতে নিঃশব্দে চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে এলো। চাঁদু মাথায় হাত রাখলো। রূপা এগিয়ে এসে আমার গা ছুঁয়ে বসলো। এই টেপরেকরেকর্ডার, এই ক্যাসেট বাবা ছাড়া কেউ পাঠাননি। অনেকক্ষণ বেঁহুশের মতো থেবড়ে মেঝেতে মিশে ছিলাম।

রূপা জামা কাপড় ঝাড়তে গিয়ে ভাঁজ করা একটা চিঠি পেলো। আমার নাম লেখা। না পড়ে এগিয়ে দিলো। বাবার  হাতের লেখা। সোজা টানটান। কাটাকুটিহীন। নির্ভুল বানান। প্রত্যেকটা অক্ষর স্পষ্ট। যেনো বনগাঁর বাড়ির সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা ভীষণ চেনা প্রতিটা জিনিসপত্রের মতো স্বচ্ছ স্ফটিকদানা। ‘খোকা, সাবধানে থাকিস। ভালো থাকিস। ডাকলেই বাড়ি ফিরে আসতে যেনো অভিমান করিসনে – বাবা।’ 

আমাকে লেখা বাবার প্রথম চিঠি এবং শেষ চিঠি। নিজেকে আর চেপে রাখতে পারলাম না। হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলাম। 

30