কুলিক রোববার: ঘরের কাছে আরেক ঘর

শৌভিক রায়

পর্ব পাঁচ

আন্তর্জাতিক সীমান্ত ঘেঁষা জেলা শহর মালদহের নাম আরবি শব্দ ‘মাল` বা সম্পদ থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়।

গৌড়বঙ্গে এমনিতেই নদীর সংখ্যা প্রচুর। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জলাভূমিও রয়েছে অনেক। ফলে কোনও জলাভূমি বা দহ থেকে মাল ওঠানামার তত্বটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতে সমগ্র অঞ্চলটি রেশম ও সুতি কাপড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। ফলে ইউরোপিয়ান বানিয়াদের এই অঞ্চলে আসতে দেরি হয়নি। ওলন্দাজদের দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই আসা। পরে আসে ইংরেজ ও ফরাসিরা। ইতিহাস বলছে ১৬৮০ সালে ইংরেজরা একটি ছোট্ট গ্রাম কিনেছিল। সেখানেই তৈরি হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি। সেই কুঠিকে ঘিরে যে জনবসতি ধীরে ধীর গড়ে উঠেছিল তার নাম ছিল ইংলেজাবাদ। কালক্রমে সেটিই হয়ে যায় ইংরেজবাজার।

….গৌড়ের গৌরব আজ অস্তমিত। আধুনিক এই সময়ে গৌড়ের কাছের মালদা বা মালদহ (ইংরেজবাজার সহ) বঙ্গদেশের অন্যতম পরিচিত স্থান। যে গৌড়কে ঘিরে একদিন বাংলার রাজনীতি ও সমাজনীতি আবর্তিত হত, আজ সেই গৌড় একা, নিঃসঙ্গ। ইতিহাস এখানে কথা বললেও, বড্ড মৃদু তার কণ্ঠ।

সেলামি দরজা, প্রাসাদ, জাহাজঘাটি ইত্যাদি দেখে পৌঁছে গেলাম কদম রসুল মসজিদে। এখানে রাখা হয়েছে হজরত মহম্মদের পায়ের ছাপ। বলা হয়, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ মদিনা থেকে এই পায়ের ছাপ নিয়ে আসেন। তবে মহদীপুরের মৌলবী পরিবার এই পায়ের ছাপ দেখাশোনা করেন বলে, দিনশেষে চরণচিন্হ বিশিষ্ট প্রস্তরখন্ড ফিরে যায় সেই গ্রামে। নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ নির্মিত অপূর্ব সুন্দর এই মসজিদের একদিকে রয়েছে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি দিলওয়ারের পুত্র ফতে খাঁর সমাধি। অলৌকিক নানা কাজে পারদর্শী নেক বিবির সমাধিটিও মসজিদ ঘেঁষা।

মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমবাগানের ভেতর দিয়েই পৌঁছে গেলাম চিকা মসজিদে। রূপ সনাতনকে বন্দি করে এখানেই রাখা হয়েছিল। অবশ্য কারারক্ষীকে হাত করে তাঁরা মহাপ্রভুর কাছে চলে গিয়েছিলেন। চিকা মসজিদের কারুকাজ অত্যন্ত সুন্দর। গম্বুজটির আকারও বিরাট। এককালে বাদুড়দের বসবাসের জন্য ৯৫ মি দৈর্ঘ্য-প্রস্থের এই মসজিদটির নাম হয়েছে চিকা মসজিদ। তবে একটু নজর করলেই এই মসজিদে এমন কিছু স্থাপত্য নজরে পড়ে যা হিন্দু স্থাপত্যের পরিচয় দেয়। মসজিদের কাছেই রয়েছে গুমটি দরওয়াজা আর দাতন মসজিদ।

কদম রসুল ও চিকা মসজিদের লাগোয়া লুকোচুরি গেট না দেখলে গৌড় দর্শন অসম্পূর্ণ থাকে। দ্বিতল এই দরজাটি ৬৫x৪২.৪ ফুট। গৌড়ের পূর্বদিকে থাকা এই দরজাটি ১৫২২ সালে হুসেন শাহ তৈরি করেছিলেন। অবশ্য অন্য মতে বলা হয়, ১৬৫৫ সালে শাহ সুজার নির্মাণ করেন এই রাজকীয় দরজা। বেগমদের সঙ্গে নবাবের লুকোচুরি খেলার ব্যবস্থা ছাড়াও এখানে নহবত বসত। দিনরাত্রি পাহারা দিত সশস্ত্র সৈনিকেরা।

রাজকীয় দরজা দেখার নেশায় চলে আসি কোতোয়ালি দরজায়। তিরিশ ফুট উচ্চতার আর ১৭ ফুট প্রস্থের খিলানযুক্ত এই বিরাট দরজাটি গৌড়ের দক্ষিণ দিকে নির্মিত হয়েছিল। পুরাতত্ব বিভাগের লেখায় দেখতে পাচ্ছি- Approximating in style to early Delhi architecture, it was probably built between the earliest inscription found at Gour (1235 AD) and Allauddin Mohammed Khiljis death (1315 AD) when influence of Delhi predominated at Gour. কোতোয়ালি দরজায় পৌঁছে মনটা অন্যরকম হয়ে গেল। দরজার এপারে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে তারা গেট পার করে চলে যাচ্ছে ওপারে বাংলাদেশে। সীমান্ত রক্ষীদের অনুমতি নিয়ে দরজার পাশে উঁচু ঢিপির ওপর উঠলাম। জানা গেল ওপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামের জনপদ। দেখা গেলরাজশাহী ৮২ কিমি, ঢাকা ৩৩১ কিমি`র মাইলস্টোন। কত কাছে! কিন্তু কত দূরে….

গৌড় দর্শনের শেষ পর্যায়ে লোটন মসজিদ। ১৪৭৫ সালে সম্ভবত ইউসুফ শাহ এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তবে কিংবদন্তি বলে কোনও এক রাজগণিকা এর নির্মাতা। মনে করা হয়, এই মসজিদের দেওয়াল রঙিন ইঁট দিয়ে নির্মিত ছিল। সবুজ, হলুদ, নীল ও সাদা রঙের মিনা করা তলী অবশ্য আজও দেখা যায়। লোটন মসজিদের কাছে গুণমন্ত আর চামকাটি মসজিদও অত্যন্ত সুন্দর।

শেষ হল গৌড় দর্শন। ইতিহাসকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললাম এবার দক্ষিণ দিকে। আসলে সভ্যতা মানেই তো নদীমাতৃক। প্রবাহের অস্তিত্ব যেখানে নেই, সেখানে জনপদেরও সেরকম চিহ্ন থাকে না। গৌড়বঙ্গে যদি এত সংখ্যক নদী না থাকত তবে গৌড় হয়ত সৃষ্টিই হত না। আর এই সব নদীদের শ্রেষ্ঠটি অতি অল্প দূরেই রয়েছে। তাই এত কাছে এসে সেই নদীকে স্পর্শ করব না সেটা হয় না।

চললাম তাই ফারাক্কায় আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ নদী পতিতপাবনী গঙ্গার স্পর্শ নিয়ে নিজেকে একটু পবিত্র করতে। এই তো মাত্র কয়েকদিন আগে ঋষিকেশে এই গঙ্গায় ভাসিয়ে এসেছি আমার নষ্ট আত্মার সব অহংকে। আবার আজ গঙ্গা চোখের সামনে।

মনে মনে বলে উঠলাম তাই- বারবার নষ্ট হয়ে যাই প্রভু তুমি আমাকে একবার পবিত্র করো...

(ক্রমশ)

41