কুলিক রোববার: স্মৃতি : ৬১

সাধন দাস

মিতুদার মৃত্যু

মিতুদারা সব অফিসে, সব ক্লাবে, চায়ের ঠেকে, আড্ডায় থাকে। আমাদের কলিগ মিতুদা একটু বেশি সরল। 

একটুতে সবাইকে ভালোবেসে ফেলে। বিশ্বাস করে। চেলকো কলিগরা পেছনে লাগে। 

– ও মিতুদা, আমাদের ভালোবাসো? 

– হ্যাঁ, বাসি তো। 

– চন্দ্রাকে ভালোবাসো। 

– হ্যাঁ। 

চন্দ্রা সুধাংশুর পাশের টেবিল। লজ্জা পায়। কিন্তু মিটিমিটি হাসে। 

সুধাংশু চন্দ্রার প্রেমিক। জিজ্ঞেস করে – এরপরেও বৌদি তোমাকে ভালোবাসে? 

– হ্যাঁ, বাসে।

– তাহলে দু’জন মেয়েমানুষকে ভালোবাসো? 

– দু’জন কেনো। কতো মেয়েমানুষকেই তো ভালোবাসি। 

-ওই জন্যে বৌদি তোমাকে পেটায়। 

– তোদের বৌদির কপাল ফেটে গেছে। অনেক রক্ত পড়েছে। খুব কষ্ট পাচ্ছে। 

– ফাটলে তো রক্ত পড়বেই! কে মারলো? 

– তোরা বলেছিলি, আমার বাড়ির জমিটা ব্যাঁকা, ঘেরার জন্যে ব্যাঁকা ইট কিনতে হবে। ব্যাঁকায় ব্যাঁকায় সোজা। ভাঁটায় ঝামা ইট অর্ডার দিয়েছিলাম, তাই তোদের বৌদি আমাকে হুড়কো দিয়ে ঠেঙিয়েছে। 

– তুমি কেঁদেছিলে? 

– হ্যাঁ। তবে মেরেছিলো বলে নয়। আমার বুদ্ধি কম। ব্যাঁকায় ব্যাঁকায় আরো ব্যাঁকা হয়, বোঝাবার জন্যে, মারতেই পারে। কিন্তু মারের চোটে ভয় পেয়ে মেয়েটা কাঁদছিলো। ছেলেটা খেপে মাকে শ্লেট ছুঁড়ে মেরেছে। তোদের বৌদির কপাল ফেটে গেছে। ভাবলেই কষ্ট হচ্ছে। মন ভালো নেই। ব্যাঁকায় ব্যাঁকায় কতো ব্যাঁকা হয় দেখলি তো! আমাকে আর ভুল শেখাবি না। 

– কাঁদলে কেনো? 

– মা ছেলের হাতে মার খেলো। ওই জন্যে কেঁদেছিলাম। তোদের মায়া হয় না? 

মিতুদার পেছনে লাগার জন্যে বস বকলেন। অর্ডার দিলেন, দরকার ছাড়া কেউ যেনো মিতুদার সাথে কথা না বলি। একদিন গেলো। দু’দিন গেলো। মিতুদার দম বন্ধ অবস্থা। নিজের টেবিল থেকে ছলছল চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। তিনের দিন থেকে টেবিলে টেবিলে ঘুরছে। অন্যের কথার সেধে সেধে অকারণ উত্তর দিচ্ছে। কেউ সাড়া দিচ্ছি না। পাঁচদিনের দিন আর সহ্য করতে না পেরে আমার টেবিলে এসে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো। 

– তোরা কথা না বললে আমার ভয় করে, যেনো একা হয়ে গেছি। রাত্রে শুয়ে শুয়ে, এতো বড়ো পৃথিবী, আমি একা, ভাবলেই ভয় বেড়ে যায়। ঘুম আসে না। অস্থির লাগে। বুকের ভিতর ধড়ফড় করে। ঘেমে নেয়ে উঠি। মনে হয়, হার্টফেল করে যাবো। তোরা আর পেছনে লাগবি না? কবে লাগবি? 

– যাও, বসের ঘরে, পেছনে লাগার পারমিশান নিয়ে এসো। লিখিত এনো কিন্তু। 

মিতুদা খুশি। দুলতে দুলতে বসের চেম্বারে ঢুকে গেলো। বস পারমিশন দিলেন না। ইচ্ছা থাকলেও, আমরা কথা বলি না। 

সেদিন, মিতুদা টুলে উঠে ফাইল পাড়ছিলো। মাটি থেকে মাত্র এক হাত উঁচু! পা ফসকে পড়লো। আর মরে গেলো! 

কেউ বিশ্বাস করছে না, একহাত উঁচু থেকে পড়ে কেউ মরতে পারে, অসম্ভব। চন্দ্রাই প্রথম বুকে কান, নাকে হাত দিয়ে, স্থির মণি চোখের খোলা  পাতা বন্ধ করে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো- বিশ্বাস করুন, মিতুদা মরে গেছে।   

সাধন দাস।

24