কুলিক রোববার: ঘরের কাছে আরেক ঘর

শৌভিক রায়

পর্ব -৪

গৌড়ে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে বারবার। আর তার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে গৌড়ের ভাগ্যও। আজ গৌড়ে যা অবশিষ্ট তা দেখে কোনও একটি নির্দিষ্ট বংশ বা সময়কে বিচার করা যায় না। বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন বংশের শাসন নিয়েই অতীতের গৌড়।

বড় সোনা মসজিদ বা বারোদুয়ারীর পর, দাখিল দরওয়াজা দেখে মনে হল The Cambridge History of India-এর কর্তাব্যক্তিরা খুব কিছু ভুল বলেননি। তাঁদের মতে দাখিল দরওয়াজা বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ইঁটের নির্মাণ। সত্তর ফুট উচ্চতার আর সাড়ে তেরো ফুট দৈর্ঘ্যের, লাল ইঁটে তৈরি এই বিরাট তোরণটি, ১৪২৫ সালে, নির্মাণ করেন বারবাক শাহ। তাঁর প্রাসাদে প্রবেশের মূল এই তোরণটি ছিল পরিখা দিয়ে ঘেরা। আজও তার প্রমাণ মেলে। সম্ভবত সেই আমলে ভাঁজ করা সাঁকো ফেলে পারাপার করা হত সেই পরিখা। পরিখায় ছাড়া হত হিংস্র সরীসৃপ। তোরণ থেকে কামান দাগার ব্যবস্থাও ছিল। ফলে সেলামি দরওয়াজা বলেও পরিচিত এটি। কিছুদিন আগে উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনে ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট দেখে এসেছি। সেখানকার ইঁটের তৈরি অনুপম প্রাসাদ মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। দাখিল দরওয়াজা দেখে হঠাৎই সে কথা মনে পড়ে গেল। দাখিল দরওয়াজা নিঃসন্দেহে তার পাশে কিছুই নয়। কিন্তু প্রাচীনত্বের দিক থেকে এই নিৰ্মাণ অতি অবশ্যই তাকে টক্কর দিতে পারে। আজ থেকে ৬০০ বছর আগেও যে এরকম নির্মাণ সম্ভব ছিল, তা দাখিল দরওয়াজা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

পনের শতকে গৌড়ের শাসক যদু বা জালালউদ্দিনের মৃত্যুর পর পাঠান সেনাপতি নাসিরুদ্দিন গৌড় দখল করেছিলেন। তাঁর পুত্র ছিলেন বারবাক শাহ। মসনদে বসে তিনি তৈরি করেছিলেন সুরম্য এক প্রাসাদ। সেই প্রাসাদের বিশেষত্ব হল, সেটি ছিল দিঘির ওপর। দাখিল দরওয়াজা পার করে চাঁদ দরওয়াজা আর নিম দরওয়াজা হয়ে পৌঁছনো যেত প্রাসাদের দরবার মহলে। প্রাসাদের আর এক অংশে ছিল খাস মহল। তবে বারবাক শাহ শুধুমাত্র তিনটে তোরণ নির্মাণ করেই প্রাসাদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। ফলে, তৈরি হয়েছিল আর একটি অভিনব প্রাচীর। ১৫৬০সালে নির্মিত সেই প্রাচীরের নিচের দিক ছিল ১৫ ফুট আর ওপরের দিক সরু হয়ে ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি প্রশস্ত করা হয়েছিল। এই প্রাচীরটি বাইশগজী প্রাচীর নামে পরিচিত। আজও এই প্রাচীর দেখে বিস্মিত হতে হয়।


বাইশগজী প্রাচীর আর প্রাসাদের এলাকাটি আমবাগানে ঘেরা। চারদিকে এত আমগাছ আমি আর কোনোদিন দেখিনি। প্রত্যেক গাছের ডাল নুইয়ে পড়েছে আমের ভারে। এদের দেখেই মনে হল, এরাই সেই প্রকৃত জ্ঞান তাপস যাঁরা মাথা নিচু করতে জানে। আমাদের মতো অল্পবিদ্যা নিয়ে লাফালাফি করে না।

বাইশ গজী প্রাচীর

আমবাগানে ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে করতে আর মাটিতে পড়ে থাকা আম কুড়োতে কুড়োতে পৌঁছে গেলাম জাহাজঘাটায়। ছোট্ট জলাশয়ের পাশে ইঁটের নির্মাণ দেখলে বোঝা যায় না, এখান থেকে একদিন জলপথে যাওয়া যেত দূরে কোথাও। পরিত্যক্ত সেই জাহাজঘাটা দেখে মন বিষণ্ণ হয়ে যায়, যেমন হয় বিরাট সেই প্রাসাদের ভগ্ন অবস্থা দেখে। কিন্তু এটাই প্রকৃতির নিয়ম, এটাই সময়ের সবচেয়ে বড় শত্রুতা। সময় যেমন দেয় অনেককিছু, তেমনি কেড়েও নেয় নিজের মতো করে!

বারবাক শাহকেও সময় অনেককিছু দিয়েছিল। কিন্তু কেড়েও নিল সব একদিন। আর সেই করাল ‘একদিনে’ হাবসি সুলতান সইফ উদ্দিন ফিরোজ শাহ হত্যা করলেন বারবাক শাহকে। দখল করলেন গৌড়। জয়ের স্মৃতিকে অক্ষয় করতে তুঘলকি শৈলী আর টেরাকোটায় সমৃদ্ধ এক মিনার বানালেন, যা আজ ফিরোজ মিনার নামে পরিচিত। দিল্লির কুতুব মিনারের আদলে তৈরি এই মিনারটি ২৬ মিটার উচ্চতার ও ১৯ মিটার বেড়ের। মোট তল পাঁচটি। প্রথম তিন তল ১২ দিক বিশিষ্ট আর শেষ দুই তল বৃত্তাকার। মোট সিঁড়ি রয়েছে ৭৩টি। সিঁড়িগুলি ঘোরানো। এই মিনার থেকে আলোর সংকেতে খবর আদানপ্রদান করা হত বলে পীর-আশা-মিনার বা চিরাগদানি নামেও পরিচয় রয়েছে ফিরোজ মিনারের। মিনারটি নির্মাণ করে পীরু মিস্ত্রি নাকি ফিরোজ শাহের গলা থেকে মোতির মালা উপহার পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্য তাঁর সঙ্গে বেশিদিন ছিল না। নিজের বোকামিতে শাস্তি পেয়ে ফিরোজ শাহের আদেশেই মিনারের চুড়ো থেকে মাটিতে পড়ে প্রাণ খোয়াতে হয়েছিল তাঁকে।

ইতিহাসের এই রসিকতায় নিজের মনেই হেসে উঠলাম। ছোট্ট এক জীবনে আমাদের কত মান অভিমান রাগ ক্ষোভ দুঃখ হতাশা! সামান্য কারণে কত বিবাদ, লাঠালাঠি, হানাহানি, হত্যা, গুপ্তহত্যা। কী হয় এতে? একদা গর্বের প্রতীক ওই বিজয়স্তম্ভ আজ সাধারণ মানুষের করুণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের কালো গহ্বরে কোথায় বারবাক আর কোথায় ফিরোজ! সব ধুয়ে মুছে সাফ। সময় বড্ড নির্মম। ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলি আবার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি নিয়ে ইতিহাসের অন্য আর এক অধ্যায়ে…
(ক্রমশ)

53