কুলিক রোববার: স্মৃতি:৬০

সাধন দাস

আরএনবি স্যর 

গোবরডাঙা ব্রাঞ্চে ট্রান্সফার হয়েছি। গোবরডাঙা আমার কলেজ স্মৃতির শহর। অফিস শেষে একদিন বিটি কলেজের পিছন দিয়ে কলেজ বাউণ্ডারিতে ঢুকে পড়লাম। দূরে ছবির মতন সেই বিস্কুট রঙা মেনবিল্ডিং। গোবরডাঙা হিন্দু কলেজ। সামনেই হোস্টেল। দোতলার ১৬ নম্বরে ধীরেন্দুশেখরের জানলা আজো খোলা। যদি দেখে ফেলে! আধুনিক কবিতা গেলাবে। না, দাঁড়াবো না। বিকেল হয়ে আসছে। ট্রেন ধরবো। বিস্তীর্ণ আজও সেই সবুজ মাঠ। যেনো বাসু, প্রদীপ, অরুণদা, বিকাশদা জবাদি গোল হয়ে আড্ডা মারছে। দেখতে পেলে বাসু ডেকে উঠবেই- সাধন, শুনে যা…। 

বিকেলের প্রাচীন আভায় মুখ আড়াল করে ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে হাঁটছি। কৃষ্ণচূড়ার নিচে দাঁড়ালাম। ক্যান্টিন তালাবন্ধ। তবু কিচেন থেকে ঘুগনি ফোটার গন্ধ আসছে! ভিতরে যেনো কারা ক্যারম পিটছে! স্ট্রাইকার ঘুঁটির খট খট শুনতে পাচ্ছি। মেয়েদের ভয় দেখাতে ক্যান্টিনে ভূতের গল্প চলতো। ভূতগুলো কি সত্যি হয়ে গেছে! এগিয়ে গেলাম।  ইংরিজি ক্লাসের নিচে অনেক ছায়া জমেছে।  আরএনবি স্যর জুলিয়াস সীজার পড়াচ্ছেন!   

টানটান দাঁড়িয়ে লম্বা উঁচু মানুষটা টিচিং প্লাটফর্মে। একটু ঝুঁকে নাটকীয় ভঙ্গিতে একটা পা পিছিয়ে একটা এগিয়ে। শরীরের সামনের অংশ প্লাটফর্মের বাইরে বের করে দিয়েছেন। ডানহাতে ডানা মেলে সাঁতার কাটছেন শূন্যে। উদাত্ত সুরেলা কণ্ঠস্বর। ভেসে যাওয়ার মুহূর্ত। আবেগে উচ্চারণ করে চলেছেন– 

There is a tide in the affairs of men

Which, taken at the flood, leads on to fortune

Omitted, all the voyage of their lives 

Are bound in shallows and in miseries 

প্লাটফর্ম থেকে পড়ে যাবেন নাকি! সামলে নিলেন। 

অভিনেতা নাট্যকার উৎপল দত্ত নাকি স্যরের সহপাঠী। গলায় গলায় বন্ধু। দু’জন একজনকেই নাকি ভালোবাসতেন! বাজি হয়েছিলো, যে ফার্স্ট হবে সেই প্রেমিকাকে পাবে। সেবার আরএনবি নাকি সেকেণ্ড হয়েছিলেন।  

The fault, dear Brutus, is not in our stars 

But in ourselves  

স্যরের প্রেম আমাদের কলেজ জীবনে অতিসত্যি। স্যরের জীবনে সত্যি ছিলো কিনা জানি না! 

বসতাম লাস্ট বেঞ্চের প্যাসেজ সাইডে। স্যরকে শোনা যেমন, দেখাও যেতো অনেকখানি। 

হুশ ফিরে এলো। যাবো নাকি একবার দোতলায়, ক্লাসরুমে! যদি আমার সাথে সেদিনের আমির দেখা হয়ে যায়!     

আরএনবি, রণেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে আছেন ব্যাঙ্কের কাউন্টারে আমার সামনে। আট বছর পর। সেই ঋজু, সেই কাঠিন্য ঘেরা, একই সমীহ উদ্রেককারী ব্যক্তিত্ব। 

– স্যার, আমি সাধন। সাধন দাস। নাইন্টিন সেভেনটি টু সেভেনটি থ্রি। 

সোজাসুজি আমার চোখে তাকালেন। ঠোঁটে সেই মিষ্টি রহস্যময় চিলতে হাসি। 

– আমাদের পত্রিকায় একটা লেখা দেবেন? 

– কী পত্রিকা? 

– রৌরব।

‘ইংরিজি সাহিত্যে বাস্তবতা’ বিষয়ে একটি মূল্যবান লেখা দিয়েছিলেন। ছাপাও হয়েছিলো। স্যর জানতেন না, রৌরব লিটল ম্যাগাজিন। লিটল ম্যাগে লেখার পারিশ্রমিক দেওয়ার রীতি নেই, সামর্থও নেই। বারবার জানানো সত্ত্বেও স্যর লেখাটির জন্যে টাকা চাইতেন। গোবরডাঙা ছেড়ে আসার আগে পর্যন্ত মাথা নিচু করে কথা বলতাম। স্যার মাথা উঁচু করে চলে যেতেন। শেষ পর্যন্তস্যরের সাথে আমার দেনাদারের সম্পর্ক রয়ে গেলো। আমি ট্রান্সফার হয়ে গেলাম।     

44