কুলিক রোববার: ঘরের কাছে আরেক ঘর

শৌভিক রায়

পর্ব ৩

দুই দিকে দুই নদী আর মাঝে এক জনপদ। সমৃদ্ধ সেই জনপদ অতীতের স্মৃতি নিয়ে কোনোমতে আজ যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। চারদিকের আম বাগান, জলাশয়, মেঠো পথ, সরল জীবন দেখলে কে আর বিশ্বাস করবে যে, এখান থেকেই একসময় শাসন করা হত বঙ্গভূমি!

অবশ্য কোনও একসময় এখানে ছিল শবর, পুলিন্দ ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষদের বসবাস। নির্ঝঞ্ঝাট সেই ভূখণ্ডে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন শশাঙ্ক। সাম্রাজ্যের নাম হয় গৌড়। জনশ্রুতি, গুড়ের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল এই অঞ্চল। তাই গুড় থেকে গৌড় শব্দটির উদ্ভব।

৬০২ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কের প্রতিষ্ঠিত রাজ্যের রাজধানী অবশ্য ছিল মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ আর তাঁর রাজ্য অভিষেকের আগে, গৌড় ছিল পুন্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত। শশাঙ্কের পর গৌড়ের রাশ চলে যায় হর্ষবর্ধনের হাতে। শুরু হয় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের রমরমা। এরপর চলে সূর বংশীয় রাজাদের রাজত্ব। কিন্তু একই সঙ্গে সৃষ্টি হয় এক টালমাটাল অবস্থা। রাজনৈতিক এই ডামাডোল চলে অন্তত ১০০ বছর। গৌড়ের অবস্থা আবার শান্ত হয় যখন গৌড়বাসীরা রাজ্যের হাল ফেরাতে পৌন্ড্রবর্ধনের উত্তরপুরুষ গোপালদেবকে রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ করেন। শুরু হয় গৌড়ের নতুন অধ্যায়। কালিন্দী নদীর তীরে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়।

গোপালদেবের কীর্তিকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেন তাঁর পুত্র ধর্মপাল ও ধর্মপালের পুত্র দেবপাল। বিস্তৃতি ঘটে রাজ্যের। সমগ্র আর্যাবর্তে গৌড় তখন ঈর্ষা করবার মতো এক অনবদ্য দেশ, যেখানে বাড়িঘর কালো ব্যাসল্ট পাথরে তৈরি আর নকশায় অনবদ্য। গড়ে ওঠে বৌদ্ধবিহার, বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ও। সেই সুন্দর গৌড়ের স্থপতি সে আমলের দুই দিকপাল ভাস্কর ধীমান ও বীটপাল। এই বংশের শেষ রাজা রামপালের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ রাজার হাত থেকে গৌড়ের ক্ষমতা দখল করেন হিন্দু রাজারা। ইতিহাসে সেন বংশ নামে পরিচিত এই রাজাদের রাজত্বকাল শুরু হয় ১২ শতকে। গৌড়ের স্বর্ণযুগ বোধহয় ছিল এই সময়টি। কেননা বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেনের হাত ধরে গৌড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিদেশেও। গৌড় পরিচিত হয় লক্ষ্মণাবতী নামে। শিক্ষা-সংস্কৃতি-শিল্প সব দিক থেকেই গৌড় তখন পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়েছে।

কিন্তু সেন বংশেরও পতন হল। ১১৯৮ সালে প্রথম আক্রমণ করে বখতিয়ার খিলজি সাফল্য না পেলেও, ১২০২ থেকে ১২০৪ সালের মধ্যে গৌড়ে শুরু করলেন নবাবী শাসন। লক্ষ্মণাবতী হয়ে গেল লখনৌতি। ১৩৩৯ সালে পাঠান বংশের আফগান নায়ক ফকরুদ্দিন গৌড়ের মসনদে বসলেন। ১৪১৪ থেকে ১৪৩০ অবধি চলে জালালউদ্দিনের রাজত্ব। ইনি ছিলেন হিন্দু রাজা গণেশের পুত্র যদু। পিতৃ-আদেশে তিনি মুসলিম ধর্ম নিয়েছিলেন।

রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী গৌড়ে এরপর দেখা যায় ইলিয়াসশাহী বংশের রাজত্ব। গৌড়ের শেষ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে হোসেন শাহের বংশকে। ১৪৯৪ থেকে ১৫২৫ অবধি তাঁরাই ছিলেন গৌড়ের কর্তা। কিন্তু ১৫৩৭ সালে শের শাহের আক্রমণ ও ১৫৭৫ সালের ভয়াবহ প্লেগে গৌড় ধ্বংস হয়ে যায়। একসময়ের সুরম্য হর্ম্য আর প্রশস্ত রাজপথের গর্বের গৌড় আজ ইতস্তত বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে!

রামকেলি থেকে খানিকটা এগিয়ে গৌড়ের অন্যতম বৃহত্তম স্মৃতিসৌধ বারোদুয়ারীর সামনে দাঁড়িয়ে মন খারাপ হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল বাবার তোলা সাদা-কালো সেই ছবির কথা যা আজও রয়েছে আমাদের পারিবারিক সংগ্রহে।

১৬৮ x ৭৬ ফুট চওড়া ৪০ ফুট উঁচু মসজিদটির নির্মাণ শুরু করেছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ। শেষ করেন তাঁর পুত্র নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ। অবশ্য আজকাল বলা হচ্ছে, ‘এ মসজিদটির নির্মাণকাল সঠিক ভাবে জানা যায় না। মেজর ফ্রাঙ্কলিন মসজিদটির কাছে একটি শিলালিপি খুঁজে পান, ধারণা করা হত এটিই এই মসজিদটির শিলালিপি। এতে তারিখ ছিল ৯৩২ হিজরি সন (১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ), এটি অনুসারে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন সুলতান হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহ। পরে মসজিদের ঠিক বাইরে উত্তর-পশ্চিম কোণে আরেকটি শিলালিপি পাওয়া যায় যা এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। এতে ৯৩০ হিজরি সনে (১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দ) নুসরত শাহ কর্তৃক একটি তোরণ নির্মাণের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেহেতু এ শিলালিপিটি মসজিদের অধিক কাছে পাওয়া গেছে, তাই এটি মসজিদের তোরণটির শিলালিপি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের ভবনের তোরণ মূল ভবনের আগে নির্মাণ করা হয় না। মেজর ফ্রাঙ্কলিন প্রাপ্ত শিলালিপিটির তারিখ এ শিলালিপির পরের। তাই সেটি মসজিদের শিলালিপি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাছাড়া নুসরত শাহ কর্তৃক নির্মিত বাঘা মসজিদের স্থাপত্য শৈলীর সাথে এর অমিল রয়েছে যথেষ্ট। এর ফ্যাসাদগুলোতে অলংকরণ খুবই কম, নেই বললেই চলে। তবে মিহরাবগুলোতে অলংকরণ রয়েছে। বরঞ্চ, আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলের প্রথমার্ধে নির্মিত ছোটো সোনা মসজিদের সাথে এর স্থাপত্য শৈলীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। স্থাপত্যশৈলীর এই মিল এবং পরে প্রাপ্ত শিলালিপিটির তারিখ থেকে এটা মনে হওয়া অসম্ভব নয় যে মসজিদটি আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলের শেষের দিকে নির্মিত হয়েছিল।’

ইন্দো-আরবি ঘরানার এই মসজিদটি নামে বারোদুয়ারী হলেও এর প্রবেশদ্বার আসলে এগারোটি। মসজিদের মাথায় রয়েছে ১১টি গম্বুজ। অতীতে তাদের সংখ্যা ছিল ৪৪। গম্বুজের সোনালী চিকন কাজের জন্য এই মসজিদের নাম বড় সোনা মসজিদ বলেও পরিচিত। কেননা গৌড়ের কাছে ,ফিরোজপুর গ্রামে, সোনালী চিকনের কাজ করা এরকম আরেকটি মসজিদ ছিল। সেটি ছিল আকারে ছোট। তাই এই মসজিদটিকে বলা হত বড় সোনা মসজিদ, আর ফিরোজপুরেরটিকে বলা হত ছোট সোনা মসজিদ। গবেষণা বলছে, মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বে পার্শ্বের মাঝ বরাবর খিলানযুক্ত তোরণ ছিলো। এখন উত্তর ও পূর্বের তোরণ দুটি দেখা যায়। এ তোরণের মাপ ৩৮.৫ফুট x ১৩.৫ ফুট । ‘একসময় এটি পাথর আবৃত ছিলো। এতে সাদা, নীল, সবুজ, হলুদ ও কমলা রঙ এর কাচের টাইলের উপর ফুল সদৃশ অলংকরণ ছিল। মসজিদ ভবনটির চারপাশে চারটি এবং মূল প্রার্থণালয় ও করিডোরের সংযোগস্থলে দুটি- মোট ছটি বুরুজ আছে। প্রতিটিই অষ্টকোণাকৃতি।’

যতটা পারি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম গৌড়ের এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। অতীতে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব থাকলেও, আজ খানিকটা উন্নতি হয়েছে সেই অবস্থার। তবু মনে হল, এই অতীত স্মৃতি সংরক্ষণে আরও মনোযোগী হওয়ার দরকার রয়েছে আমাদের সকলের। শুধুমাত্র সেলফি তুলে আর সমাজ মাধ্যমে পোস্ট করে ‘আমিও দেখেছি` ঘোষণা করবার আগে, সবারই কম বেশি জানা উচিত ঠিক কোন ঐতিহ্য বহন করে চলেছি আমরা। সেই ইতিহাস যদি ধরে রাখতে না পারি তবে পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু আমাদেরকেই দায়ী করবে!

(তথ্য সহায়তা: বাংলার ইতিহাস, গৌড়ের অতীত, উইকিপিডিয়া, সববাংলা)

(ক্রমশ)

49