কুলিক রোববার: স্মৃতি:৫৯

সাধন দাস

আমি আছি তো  

ডান পায়ের গোড়ালি থেকে ঊরু, সাদা প্লাস্টারে বাঁধানো। টানটান পা লুঙির বাইরে। দেওয়ালে ভর না দিয়ে সোজা বসে আছেন। পাঁজরা সর্বস্ব মানুষ। গোবরডাঙা থেকে মাজদিয়া আশি কিমি রাস্তা, শ্বশুরবাড়ি, আসছিলেন মোটরবাইকে … 

দিল খোলা সেই মিষ্টি হাসি। বললেন- এসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, আমি আছি তো।  

অনেক দিন আগের কথা। রূপা তখন নাবালিকা। ওকে বাড়ি থেকে তুলে এনেছিলাম, আমাদের বিয়ে দেওয়ার আগে তুলসিদা, বস, গোবরডাঙা ব্রাঞ্চের ডেপুটিম্যানেজার, ঠিক এই কথাই বলেছিলেন। কারো কোনো সমস্যা হলেই বলতেন- ঠাণ্ডা হ’, আমি আছি তো।  

বললাম- হেড অফিস থেকে ইন্সপেকশন এসেছে। 

যেনো শুনতেই পাননি। জিজ্ঞেস করলেন – রূপা কেমন আছে? 

বুঝলাম, ট্রেন ঠেঙিয়ে দু’বেলার রাস্তা আসা নিরর্থক। মানুষটার সব জানা বোঝা সারা। 

জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন- পা টা না ভাঙলেই পারতো। 

বললাম- দে বাবু পালিয়েছেন।

বললেন- চান করে খেয়ে নে। 

বুঝলাম, বরফ গলার নয়। বললাম- ট্রেন ধরবো। এরপরে আর ফিরতে পারবো না। 

ফিরে যাচ্ছি। ট্রেনের বাইরে ভাঙা কুঁড়েঘরের ঝাঁক। নেংটিপরা মানুষেরা উঠোনে বসে খাচ্ছে। চানঘর দূরস্ত, গা ঢাকার কাপড় নেই, তাই লজ্জাও নেই। মেয়ে বৌরা এঁদো পুকুরে উদোম চান করছে। ন্যাংটো ছেলে মাঠে গরু চড়াচ্ছে। এ দৃশ্যের শেষ নেই। ট্রেন চলছে। পায়ের কাছে বস্তায় একটা খাসি, মুখ বের করে গলা বাঁধা। জবাই দিতে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে মেজাজে ডেকে উঠছে। ব্যাএ্যা… আর চমকে উঠে শুনছি। – আমি আছি তো!  

দে-বাবু ব্রাঞ্চের স্পেশাল এ্যাসিস্ট্যান্ট। মোটা দাঁওয়ের লোভে সস্তার জমি কিনতে বিশাল পরিমান টাকা রেজিষ্ট্রি হওয়ার আগের রাতে এ্যাডভান্স করেছিলেন বুড়ো জমিদারকে। বুড়ো সে রাতেই মরে চিৎপটাং। বুড়োর ছেলে ভোরেই চোখ উল্টে দিলো। – কৈ টাকা আমরা পাইনি তো! 

দে-বাবুর চুল খাড়া। বসের সামনে বসে পড়লেন- কী হবে? 

– যা হোক হবে। আমি আছি তো।  

সেই জমিতে পাঁচঘর নেংটি পরা মানুষ বাস করে। জমিদারের ছেলে বললো- তুলে দেবো।  

ওরা এসে লুটিয়ে পড়লো। বস বললেন- ভাবিসনে, আমি আছি তো।  

স্যাকরার সাথে সাঁটে গোল্ডলোনের ব্যাগে আসল গহনার ওজনের রোলগোল্ডের গহনা রেখে পাঁচ ঘরের নামে মোটা টাকার লোন হলো। সময় এলে চুপি চুপি শোধ হয়ে যাবে। কেউ জানবে না। দেবাবুর কুবুদ্ধি, তুলসিদার কীর্তি। ধরা পড়ে গেছে। দে বাবু আর তুলসিদা লোনের স্যাংশনে সই করেছেন। দে বাবুর জেল হয়ে গেলো। জালিয়াতি দে-বাবু বহুদিন করছিলেন। জমি কেনার টাকা এভাবেই চুরি করতেন। বিশ্বাসে সই করে দিতেন বস। তুলসিদার চাকরি চলে গেলো। 

ট্রেনের বাইরে দুনিয়াটা ঘুরছে। ভাঙা কুঁড়েঘরের গ্রাম ফিরে ফিরে আসছে। পাঁচঘর এসে লুটিয়ে পড়ছে। – ভয় কী রে, আছি তো।    

31