কুলিক রোববার : ঘরের কাছে আর এক ঘর

শৌভিক রায়

পর্ব ২

গাড়ি থেকে নামতেই রোদ-স্নান হয়ে গেল। এই বছর তো আমাদের ওদিকে, মানে কোচবিহারে, রোদের মুখ সেভাবে দেখাই যাচ্ছিল না। তাই গৌড়বঙ্গের এই চড়া রোদে নিমেষেই ঘেমে উঠলাম।

কিন্তু তাতে কী! চোখের সামনে পবিত্র ভূখন্ড। আগেও এসেছি বাবা-মায়ের হাত ধরে। কিন্তু সেই স্মৃতি মিলিয়ে গেছে কবেই। তাই রামকেলির মাটি স্পর্শ করেই মন চনমনে হয়ে উঠল প্রবল গরমেও। আসলে পবিত্র রামকেলি সম্পর্কে এত কিছু শুনেছি যে, বিশ্বাসই হচ্ছিল না, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর স্মৃতি বিজড়িত জনপদটিতে চলে এসেছি।

মনে করা হয়, ১৫১৪/১৫১৫ নাগাদ শ্রীচৈতন্য এখানে আসেন। দাক্ষিণাত্য ও ওড়িশায় নিজের ধর্মের প্রচার সেরে তিনি বৃন্দাবন ও মথুরা যাবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। সেই যাত্রাপথেই জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তির সময় রামকেলিতে পা রাখেন তিনি। মহামানবের আগমনকে কেন্দ্র করে ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ জনপ্লাবন ঘটেছিল রামকেলিতে। দিন তিনেক এখানে কাটিয়ে নিজের পথে চলে যান গোরা। রেখে যান তাঁর পদচিন্হ এই গ্রামের মাটিতে। তাঁর স্পর্শে বিখ্যাত হয়ে ওঠে অখ্যাত এক গ্রাম। তবে শুধু আসাই নয়, রামকেলিতে মহাপ্রভু কিন্তু আর একটি কাজ করেছিলেন। গৌড়ের তৎকালীন শাসক হুসেন শাহের সাকর মল্লিক ও দবির খাস অর্থাৎ যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী (পূর্বনাম অমর) ও ব্যক্তিগত সহায়ক (পূর্বনাম সন্তোষ)-কে কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা দেন। তাঁদের নতুন নাম হয় সনাতন গোস্বামী ও রূপ গোস্বামী। ইতিহাস বলছে, রামকেলির ৫০০ বছরের প্রাচীন মেলা রূপ-সনাতনের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল মহাপ্রভুর আগমনকে কেন্দ্র করে। কালের নিয়মে একদিন গৌড়ের গরিমা মুছে গেলে, প্রায় ২০০ বছর মেলা অবশ্য বন্ধ ছিল। তারপর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলছে সেই মেলা।

রামকেলির মেলা চমকপ্রদ নানা কারণে। অদ্বিতীয়ও বটে! মাতৃপিন্ড দানের জন্য এই মেলা বিখ্যাত। ভারতে সম্ভবত আর কোথাও এমনটি হয় না। পিতৃপুরুষ পিন্ড পেলেও মা রয়ে যান অন্তরালে। কিন্তু হিন্দু সমাজে মায়ের প্রতি এই অবহেলার যোগ্য জবাব রামকেলি। আরও গুরুত্বপূর্ণ, এই পিন্ড দান করেন মহিলারাই। কথিত, রাজা গণেশের আমলে ফিরোজ মিনারের কাছে থাকা গয়েশ্বরী (দ্বিমতে গৌড়েশ্বরী) মন্দিরে পিন্ডদান করা হত। তখন মন্দিরের পাশেই প্রবাহিত হত জাহ্নবী নদী। মূল মন্দির গঙ্গাবক্ষে বিলীন হলেও অথবা সুলতানি আমলে ধ্বংস হলেও দেবীর পুজো বন্ধ হয়নি। সেই জাহ্নবী নদী না থাকলেও, আজও মন্দিরে পিন্ডদানের রীতি প্রচলিত রয়েছে। তবে তা কেবল মেলার সময়েই।

রামকেলি অনন্যতা আর একটি ব্যাপারে। বৈষ্ণব সমাজের ‘কন্ঠি বদল’ করে গান্ধর্ব পদ্ধতিতে বিবাহ রীতি এখানে প্রচলিত। অতীতে অবশ্য মিলন উৎসবে শুধুমাত্র অনামিকা দেখে বৈষ্ণবী নির্বাচন করা হত। কেননা বৈষ্ণবীদের চেহারা থাকত কাপড়ে আবৃত। বর্তমানে সেই প্রথা না থাকলেও, বিয়ে হয় মালাবদল করে। সম্ভবত সেজন্যই রামকেলিকে গুপ্ত বৃন্দাবন বলা হয়ে থাকে।

এতসব ইতিহাসের মধ্যে বুঁদ হয়ে দেখে নিলাম তমালতলের ছোট্ট মন্দির। এখানে রক্ষিত মহাপ্রভুর পায়ের ছাপ। সেটি অবশ্য পাথরের ওপরে। বিশ্বাস অবিশ্বাস নিজের কাছে। দুটি তমাল ও কদম গাছকে ঘিরে তৈরি বেদিতে বসতেন শ্রীচৈতন্য। এখানেই দীক্ষা নেন রূপ-সনাতন। অদূরেই মদনমোহন মন্দির। রয়েছে আটটি কুন্ড- রূপসাগর, শ্যামকুন্ড, রাধাকুন্ড, ললিতাকুন্ড, বিশাখাকুন্ড, সুরভীকুন্ড, রঞ্জাকুন্ড ও ইন্দুলেখাকুন্ড।

বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত-এ বলা হয়েছে- গৌড়ের নিকটে গঙ্গাতীরে এক গ্রাম/ ব্রাহ্মণ সমাজ তার রামকেলি নাম। একজন প্রশ্ন হল রামকেলি কেন! জনশ্রুতি, মিথিলায় যাওয়ার আগে রামচন্দ্র নাকি এই অঞ্চলে কিছুদিন কাটান। এখানকার সহজাত ফল আম খাওয়ানোর জন্য তিনি স্ত্রী সীতা, ভাই লক্ষ্মণ ও অনুচর হনুমানকে নিয়ে আম বাগানে প্রবেশ করেন। সুস্বাদু ফলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে ফলকেলি করেছিলেন বলেই নাকি স্থানটির নাম রামকেলি হয়েছে। এই গল্পও অবশ্য আমার মতে বিশ্বাস অবিশ্বাসের সীমারেখায়।

কিন্তু একটি প্রশ্ন মনে সবসময় জাগে। গৌড়ের নিকটবর্তী এই জনপদে মহাপ্রভু কেন পা রেখেছিলেন? দীর্ঘ যাত্রাপথের মাঝে শুধুই কি বিশ্রাম নিতে? নাকি তাঁর অন্য কোনও অভিপ্রায় ছিল?

আমি অবশ্য প্রশ্ন করেই ক্ষান্ত। উত্তর খুঁজবেন পন্ডিতেরা।
তার চেয়ে বরং এগিয়ে চলি। ঢুকে পড়ি ইতিহাসের আর এক অধ্যায়ে।

42