কুলিক রোববার গ্রন্থ সমালোচনা : নৃমুণ্ডের মীমাংসা

আলোচক : পুরুষোত্তম সিংহ

শুধু দেশভাগের অভিজ্ঞতা নয় দেশভাগের কারণ, পক্ষ-বিপক্ষ, সমীকরণ, চক্রান্ত নিয়ে তিনি বিস্তর ভেবেছেন। ‘নৃমুণ্ডের মীমাংসা’ আখ্যান রচনার জন্য বিরাট প্রস্তুতি, অভিজ্ঞতা ও দর্শনের প্রয়োজন। নইলে এতো গভীরে প্রবেশ করে এতো গভীর সত্য উচ্চারণ অসম্ভব। অন্ধকারময় যে ধূসর গোধূলির মধ্য দিয়ে হিন্দু বাঙালির যাত্রা (১৯৪৭-৭১) তাই এ আখ্যানের কেন্দ্রীয় সত্য।

দেশভাগের মীমাংসা কেমন? বয়ান থেকে জানতে পারি মীমাংসায় অবশিষ্ট থাকে মরণ ও মৃত্যু। বুঝতে অসুবিধা হয় না হিন্দু বাঙালির জীবন পরিসর। আক্ষেপের মালা, হতাশার হিল্লোল, বেদনার বন্যা জানিয়ে দেয় দেশভাগের উপার্জন। দেশ-রাষ্ট্র সম্পর্কে ধলা মজুমদারের ভাবনা আখ্যানের বড় অংশ জুড়ে প্রাধান্য লাভ করেছে। হিন্দু বাঙালির গভীর চিন্তা বলয়। কেন এই চিন্তা চেতনা? পরিস্থিতি, পরিণাম, বিভীষিকা এই বোধের জন্ম দিচ্ছে। কেন দেশ স্বাধীন হয়েও এই পরিণাম। অত্যাচার। কোথায় দেশ-রাষ্ট্র ধারণায় ভুল। উপলব্ধির সত্য দেশ-রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিরোধাভাসকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

এ আখ্যান কথা-কাহিনি নয়, কথাস্রোত নয়  সমাজ বাস্তবের গভীর তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়। নৌকার পাটাতন নয় তলদেশ ও জলের খবর দেয়। একটা বেহুদ্দা হুজুগে পরিস্থিতি সৃষ্টি হল দেশভাগকে সামনে রেখে। তবে সব মুসলিম অত্যাচারে, হুজুগে বিশ্বাসী নয়। শিক্ষিত মুসলিম জানে লীগ বৃত্তান্ত সম্পূর্ণ ভুল। ভুল পদক্ষেপ নিল লীগ দেশভাগ করে। আসলে কোন সত্যে রাজা সরকার পৌঁছতে চান? যা ঘটেছে তা নয়, কেন ঘটল সেই বয়ান। কে দায়ী, কোন মনোভাব এই পতন সুনিশ্চিত করল তার তত্ত্বতলাশ। দাঙ্গার মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতার জন্ম হল সেই স্বাধীনতার প্রতি সাধারণ ভুক্তভোগি মানুষের বিশ্বাস কতটুকু? যে স্বাধীনতা যন্ত্রণা, শোষণ, ধর্ষণ, পাশবিক অত্যাচার, স্নায়ুনাশ, দেশত্যাগের সত্যকে স্পষ্ট করে তার সত্যাসত্য মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করবে? ধলার নোট বা ডায়েরি যেন দেশভাগের কারণ অনুসন্ধানের ডায়েরি।

কাহিনি অপেক্ষা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, প্রশ্ন জাগরণের দিকে আখ্যানের ঝোঁক প্রবল। ধলার আত্মচেতনার মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের বৃহৎ রাজনীতিকে লেখক ধরতে চেয়েছেন। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি। যে পার্টি সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা বলে, শ্রেণি শোষণ অবসানের জন্য আন্দোলন করে সেই পার্টি দেশভাগে নীরব কেন? যেখানে বৃহৎ ভূগোলের সংখ্যা লঘু জাতির অত্যাচারের সমীকরণ প্রায় স্পষ্টই ছিল সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি নীরব কেন? রাশিয়া, স্টালিনের মতাদর্শের বাইরে পার্টি যে যেতে পারেনি তা লেখক জানেন। শুধু জানা নয় কার্যক্ষেত্রেও তাই দেখা যাচ্ছে। জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি আলাদা। আগেও ধর্ম ছিল কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের চিন্তা আসেনি। মুসলিম লীগ পৃথক জাতির কথা বললেও কার্যক্ষেত্রে ধর্মকে প্রাধান্য দিয়েছিল। এ আখ্যান দেশভাগ অপেক্ষা অধিক পরিমাণে রাজনৈতিক। দেশভাগের বিনাশ, ধ্বংস, অত্যাচার অপেক্ষা রাজনৈতিক সত্য খুঁজে আনার কায়দা কৌশল।

রাজা সরকারের বয়ান মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী বাঙালিদের নিয়ে। সমাজের অধঃপতিত নিচু তলার থেকে দেশভাগকে কেন্দ্র করে আলোচনা, কেন এই ভাগ এবং গভীর ফাঁটল বলয় কোথায়, কারা দায়ী সেই রহস্য উদ্ধার করা। দেশভাগের সুযোগকে দুর্বৃত্তপরায়ণ, লোভী, আত্মস্বার্থ মুসলিম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করল। দেশভাগ মমিন মিঞাদের সুখের কপালকে চওড়া করে দেয়। লাভের গন্ধ পেলে কে আর রসদ ছাড়তে রাজি? বিরাট চেতনা, মহৎ জীবনবোধ ছাড়া সম্প্রীতি বোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। গুটি কয়েক মুসলিম ছাড়া সেই চেতনা অনুপস্থিত। ফলে সমাজ কাঠামো খড়ের ঘরের মতো ভেঙে যেতে সময় লাগেনি। ধলা রাজা সরকারের চিন্তা চেতনার, মনোভাবের সূত্রধারক। ধলার আত্মগত বয়ানে একাধিক বৃহৎ সত্য এনে লেখক দেখিয়ে দেন বড় ভুলটা কেন এবং কীভাবে ঘটল।

 দেশভাগ আমার প্রিয় বিষয়। দেশভাগের গল্প উপন্যাস স্মৃতিকথা তো কম পড়িনি। উপন্যাসখানা ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে সংগত কারণেই। উপন্যাসটিকে এগিয়ে রাখলাম।

38