কুলিক রোববার: স্মৃতি ৫৮

সাধন‌ দাস

হাঁট সাধন হাঁট   

দিন ফুরিয়ে গেছে। বিকেলের ফালি উঠোনে বাবা শুয়ে আছেন। ভীষণ লম্বা দেখাচ্ছে। খাটখানা গড় মানুষের মাপে তৈরি। হাঁটু ভাঁজ করেও পায়ের পাতা গোড়ালি মুচড়ে বেঁকে আছে। বাবার লাগছে। বোন আলতো টান করে দেওয়ার চেষ্টা করছে, পায়ে যেনো ব্যথা না লাগে। সেজো পিসি বললো- খুকি, তোর বাবা আর হাঁটবে না। 

আমার চোখ খোলা। পলক ফেলতে মস্তিষ্ক ভুলে গেছে। বাবার চোখ বন্ধ। খুলে রাখতে মস্তিষ্ক ভুলে গেছে। শেষদিকে এ রকমই চোখ বন্ধ,  দিনের পর দিন শুয়ে জেগে থাকতেন। সব্বার পায়ের শব্দ চেনেন। 

ঘরে ঢুকলেই চোখ বন্ধ রেখে বলতেন – খোকা, পা দুটো একটু টিপে দিয়ে যা। 

সারাদিন এতো হাঁটতেন, শুলেই পা ব্যথা করতো।   

উঠোনে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে বাবার মতো লম্বা লম্বা পা তুলছি ফেলছি। ভাবছি, অনেক দূরের পথ, বাবার পায়ে পা  মিলিয়ে হাঁটছি। হাঁটলে বাবার পায়ে গিঁট মটমট করে ফুটতো। আমার শব্দই হচ্ছে না। আসলে তো হাঁটছি না। দাঁড়িয়ে হাঁটার কথা ভাবছি। পা পাথর হয়ে গেছে। বাবার মতো হাঁটা অতো সহজ না। 

এগারো বছর বয়স থেকে বাবার কাঁধে বোঝা, মাথায় বোঝা, সাইকেলের পেছনে বোঝা, বাবা হাঁটছেন। নিঃস্ব সংসারের ঘাড়ে উপর দুই পিসি তিন কাকা, ঠাকুমা। বোঝা বাড়তে বাড়তে বাড়িতে বাইশ জন। বাইরে বারো সংসার। আর পারছিলেন না। ইদানিং শুয়ে শুয়ে টলমল পায়ে চলতেন। মাথা ঠিকঠাক কাজ করতো না। তাঁর ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। আজকাল মানুষ মস্তিষ্কে মারা গেলে তবেই ডাক্তারবাবু ডেথসার্টিফিকেট দেন। মা আলুথালু। বাবার বুকে কান পেতে ধ্বকধ্বক শোনার চেষ্টা করছেন। মা হৃদয়ের মরণে বিশ্বাস করেন। 

হঠাৎ আমাকে চিৎকার ডাকলেন- খোকা শোন শোন, বুকে কান পেতে দ্যাখ, ধ্বকধ্বক ধ্বকধ্বক…। 

ছুটে হুমড়ি খেয়ে পড়েছি, যদি শোনা যায়! ধ্বকধ্বক ধ্বকধ্বক… আশ্চর্য,  মস্তিষ্ক থেমে গেলেও, বাবার হৃদয়ে মরণ হয়নি। বাড়ি ভর্তি মানুষের বুকের ভিতর উথালি পাথালি ধ্বকধ্বক ধ্বকধ্বক কান্না হয়ে ঝরছেন। 

একদিন ভরা দুপুর। কাঁধে বসিয়ে বাবা আমাকে নিয়ে চলেছেন। পথের ধারে কামারশালায় নারাণজেঠু, লোহা পেটানোর শব্দ উঠছে, কুমোরপাড়ায় চাক ঘোরানোর গান ভাসছে। পাড়া ছাড়িয়ে আব্দুলকাকা জমিতে বলদ খেদাচ্ছে- হেটটেট টেট টেট…  

যাচ্ছি তো যাচ্ছি। গ্রাম ছাড়িয়ে ফাঁকা মাঠে এসে পড়লাম। তেপান্তর। সরু পথ। কাঁধে বসে একহাতে বাবার চুল খামচে অন্য হাত সোজা উপরে শূন্যে তুলে মাপছি আকাশ আর কতো উঁচুতে! লম্বা লম্বা পা ফেলে বাবা হাঁটছেন। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন জানি না।  বাবা হোঁচট খেলেন। নিজের অজান্তেই বাবার মাথার চুল পড়ে যাওয়ার ভয়ে জোরে খামচে ধরলাম। বাবা রেগে উঠলেন- আঃ ! 

কাঁধ থেকে নামিয়ে দিলেন। অসহায় লাগলো। বললেন- বড়ো হয়ে গেছিস। হাঁট। ওই শহর দেখা যায়।  

একা ভয়ে ভীষণ রেগে উঠলাম। – কে আপনি? আমি এখানে আসতে চাইনি। 

আমার হাত ছেড়ে দিলেন। আমি দাঁড়িয়েই আছি। পাথর।   

ভীড়ে কারা যেনো আমাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে– সাধন সাড়া দে। হাঁট সাধন হাঁট। নইলে পাগল হয়ে যাবি।  

121