কুলিক রোববার: ঘরের কাছে আর এক ঘর

শৌভিক রায়

পর্ব ১

তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর প্রথম বর্ষ।

দ্বিতীয় বর্ষের একটি ছেলেকে বেশ লাগত। যথেষ্ট ড্যাশিং। হাই হ্যালো থেকে ভাব জমে গেল দ্রুত।

আমার ধারণা ছিল ছেলেটির বাড়ি মালদায়। একদিন কথায় কথায় জানতে চাইলাম, মালদার কোন পাড়ায় বাড়ি তার। আমাকে অবাক করে সে বলল, আরে ভাই তোমার মতো আমি মালদার লোক নই রে! আমার বাড়ি কোচবিহারে। যখন সে জানল আমার বড় হয়ে ওঠা কোচবিহারের দিনহাটার ও জলপাইগুড়ির ফালাকাটার বাড়িতে, তখন দুজনেই হেসে মরি! সেই ছেলেটির এই স্মৃতি মনে আছে কিনা জানিনা। কেননা এখন সে ব্যস্ত সাংবাদিক। এবিপি আনন্দের পর্দায় তাকে দেখা যায় প্রায়ই। নাম তার দীপক ঘোষ।

মালদা প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে কেন জানি এই ঘটনাটিই সবার আগে মনে এলো! অথচ মারাত্মক গরমের জন্য এই শহরটিকে খুব বেশি পছন্দ কোনোকালেই করতাম না। কিন্তু কেন জানিনা শহরটা ঘুরে ফিরে বারবার এসে যায় আমার জীবনে।

মনে পড়ে যাচ্ছে বাবা-মায়ের হাত ধরে সেই প্রথম মালদা আর গৌড় দেখবার স্মৃতি। কত বয়স তখন আমার? ছয়? নাকি সাত? যাঁরা বলতে পারতেন তাঁরা আর নেই বলে নিজেও নিশ্চিত জানিনা আজ। শুধু আগফা ক্যামেরায় বাবার তোলা সাদা কালো ছবিগুলি রয়ে গেছে। সেগিলি দেখলেই মনে পড়ে যায়, টাঙায় চেপে, ঈষৎ লাল মাটির পথে, দাদার পাশে বসে, সেই চলা গৌড়ের পথে।

মালদা-ফারাক্কা মনের ভেতর রয়ে যায় আরও দুবারের জন্য। কাকভোরে ফারাক্কায় নেমে ঠাকুরদার অস্থি গঙ্গায় ভাসিয়ে আমি আর সেজকাকু মালদা ফিরে এসেছিলাম দুপুর নাগাদ। উ ব রা প সংস্থার ডিপোর ঠিক উল্টোদিকে একটি হোটেলে নিরামিষ মিল খেয়েছিলাম দেড় টাকায়। কাকু ফল খেয়েই ছিলেন। ফিরতি ট্রেন ছিল অনেকটা রাতে। ফলে সারাদিন মালদা স্টেশনে কেটেছিল। আমি অবশ্য স্টেশন লাগোয়া সদ্য তৈরি হওয়া পার্কে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আর এই কিছুদিন আগে, রীনার বাবার নশ্বর দেহকে ফারাক্কায় বিদায় জানিয়ে কাকভোরে মালদা পার করেছিলাম বিষণ্ণ হয়ে। থাকে সে কথা আজ।

কতবার যে শহরটাকে রাতের বেলায় ছুঁয়েছি! ট্রেন তো ট্রেন, বাসেও কি কম বার? কলকাতা ফেরত বাস মালদায় ঢুকলেই তো মনে হত, শিলিগুড়ি বা কোচবিহার চলে এলো! আসলে রাজধানী কলকাতা তো আমাদের মতো মানুষদের কাছে চিরকালই বহুদূরের এক শহর! তাই ওখানে গেলেই জল ছাড়া মাছের মতো দশা হত দু`চারদিনেই। হাঁসফাঁস করতাম কবে ফিরে যাব! সেই ফেরাকেই যেন স্বাগত জানাতো মালদা।

অবশেষে মালদার সঙ্গে আত্মীয়তা হয়েই গেল। আর সেটা হল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের হাত ধরেই। আমাদের ইংরেজি বিভাগের সহপাঠীরা তো অবশ্যই, অন্যান্য বিভাগের বন্ধুদের কৃতিত্বও কম নয় এই ব্যাপারে। ব্যাপারটা আরও বেশি পোক্ত হল রীনার রুমমেট সুমিতার জন্য। ও মালদার মেয়ে। ওর বর অপ্রতিম আমার রুমমেট না হলেও, এক হোস্টেলে থেকেছি আমরা। ফলে আমাদের চারজনের রসায়ন সবসময় আলাদা। আর সেজন্যই মালদা হয়ে উঠল আমার অন্যতম প্রিয় শহর। এখানেই রয়েছে আজিজুর, আফতাব, অরিন্দম, মনশ্রী, ভবানী, শুভময়, রাজীব সহ আমাদের ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের আরও অনেকে। রয়েছে অপরাজিতা, রক্তিম, শাশ্বতী, সলিল। বন্ধু পরিবার বাদেও আজকাল মালদায় রয়েছে আমার বোন বিপাশা। ওর কর্তা নীলাঞ্জন চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট অফিসার। ওদের সন্তান ছোট্ট তূর্যের কাছে আমি হলাম লাড্ডুগুড্ডু মামা আর রীনা হল ‘মহিলা`। তাই এসব কিছু মিলিয়ে মালদা আমার কাছে বেশ জমজমাট।

এবারের মালদা ভ্রমণে তাই তারিয়ে তারিয়ে কানির মোড়, কৃষ্ণপল্লি সাবওয়ে, রতন সুইটস, রাজ হোটেল মোড়, নেতাজি ক্লাব, চিত্তরঞ্জন মার্কেট, জহরা কালীবাড়ি, ৪২০ মোড়, গৌড়, আদিনা, পাণ্ডুয়া, ফারাক্কা, ফোয়ারা মোড়, বাঁধ রোড, টাউন হল ইত্যাদি সব একাকার করেছি।

মূল উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল আমাদের উ ব সারস্বত সম্মান অর্পণ কমিটির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া। শান্তিনিকেতন থেকে এসেছিলেন অধ্যাপক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য। এবার নিয়ে ওঁর সঙ্গে চতুর্থ বা পঞ্চমবার দেখা। ছিলেন অধ্যাপক আনন্দগোপাল ঘোষ সহ বহু গুণীজন। কিন্তু আমার কাছে অনুষ্ঠান গৌণ হয়ে গেছিল।

চোখে ভাসছিল অতীতের লক্ষণাবতী নগরী, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংলেজাবাদ, পিয়াস বাড়ি, কদম রসুল আর কোতোয়ালি দরজার ওপারে রাজশাহী ৮২ কিমি, ঢাকা ৩৩১ কিমির মাইলস্টোন……

(ক্রমশ)

177