কুলিক রোববার মুক্তগদ্য : লোডশেডিং এর কথা

শ্রাবণী ভট্টাচার্য

আমরা যারা আশিরও নব্বই দশকের মাঝামাঝি বড়ো হয়েছি,তাদের প্রতিদিনের জীবনে লোডশেডিং বলে একটি অধ্যায় থাকতো, এবং সেটি ছিল বেশ উদযাপনের একটি পর্ব।তখনও মধ্য বিত্তের ঘরে ইনভার্টার সে ভাবে ঢোকেনি।চার্জার এসেছে আরো পরে।সুতরাং লন্ঠন অথবা হ্যারিকেন ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা।গরম কালে প্রতিদিন এক থেকে দেড় ঘন্টার লোডশেডিং ছিলো রুটিন। অতো গরমে,ঘেমে নেয়ে ,একহাতে পাখা,অন্যহাতে মশা দের ট্যাকেল করে পড়া চালিয়ে যাওয়ার মতো মেধাবী ও আমরা ছিলাম না।অগত্যা তাই মাকে বগলদাবা করে বেরিয়ে আসতাম ঘর থেকে।একদম ছোট যখন তখন বাবার পৈতৃক বাড়িতেই  আমরা থাকতাম। দুই শরিক মিলিয়ে লোক সংখ্যা মন্দ ছিল না।আন্ডা বাচ্চাও ছিলো অনেকজন।দুই শরিকের স্কুল বাড়ির মতো বাসস্থানের মাঝখানে ছিল একফালি উঠান।উঠানে থাকতো একটা চৌকি পাতা।আর ছিল আমার মেজ দাদুদের ছাদে ওঠার আকর্ষণীয় কাঠের সিড়ি।

তা এই উঠানেই বসতো আমাদের লোডশেডিং এর আড্ডা। বড়োদের গাল গল্পের মাঝেই ওই চৌকি টাকে মঞ্চ বানিয়ে আমরা ভাই বোনেরা সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিবেশন করতাম।নাচ, গান,আবৃত্তি, হাস্য কৌতুক,এমনকি যাত্রা পর্যন্ত। আমার মা,আর আরেক কাকিমা গান করতো।আমরা বোনেরা সেই গানের সাথে নাচ তাম।অবশ্য ই রবীন্দ্র সঙ্গীত।তখন ছোট ছেলেমেয়েদের উৎকট গানের সাথে কোমড় দোলানোর সংস্কৃতি মধ্যবিত্ত বাড়িতে আমদানি হয় নি।মনে পরে,তখন সদ্য সুপারহিট হয়েছে শ্রী দেবীর নাগিনা।আমার এক বোন সেই যে কাঠের সিড়ি সেটা দিয়ে নেমে এসে অনবদ্য ভঙ্গিতে পরিবেশন করতো,”ম্যায় তেরা দুষ মন,দুশমন তু মেরা,ম্যায় নাগিন তু সাপেরা নাচ”।বড়রা হেসে গড়াগড়ি খেতো।তারপর চলতো টিভি তে সদ্য প্রদর্শিত রামায়ণ,মহাভারতের ডায়ালগ বলা,অথবা, আর্যপুত্র,আর্য পুত্র বলে সীতার কায়দায় কাঁদা,হনুমানের কায়দায় লাফ ।এসব আসরের কথা এখনও চোখের সামনে ভাসে।আবার ঝড় বৃষ্টিতে লোডশেডিং হলে বাবা হাত পাখা দিয়ে হাওয়া করা শুরু করতো। পরে নিজে ঘুমিয়ে পড়লে দেখা যেত,বাবার হাত নড়ছে ঠিকই কিন্তু পাখাটি গেছে হাত থেকে পরে।এখন গরম লাগলে কেউ আর হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে দেয় না।

বাবার ছিলো transferrable চাকরি।সেই সূত্রে আরেকটু বড়ো হতে আমরা বাবার কর্মক্ষেত্রে সপরিবারে বাসা বাড়িতে উঠলাম।বাসা বাড়ির সামনেই ছিলো একটি স্কুল এর বিরাট মাঠ।সকালে হাঁটা,বিকেলে ছেলেদের ক্রিকেট ,ফুট বল খেলায় এমনিতেই সরগরম থাকতো মাঠ।আর গরমকালে লোডশেডিং হলে তো কথাই নেই।বাড়ি তে বয়স্ক দের পাহারা বসিয়ে বাচ্চা সমেত মায়েরা হাজির হতো মাঠে। মায়েদের গল্প,ছোটদের খেলা।এখনকার মায়েদের মতো তখনকার  মায়েরা ছেলেপুলেদের পড়াশুনো নিয়ে over conscious ছিলেন না।নজরদারি চলতো ঠিকই কিন্তু নয় দশ বছর বয়সেই ছেলে মেয়েরা আইআইটি,বা ডাক্তার,উচ্চপদস্থ আমলা হওয়ার  মতো প্রতিশ্রুতি মান কিনা সেটা হরদম যাচাই করতেন না।আমরাও অত শত ভাবতাম না।সেই সময় টুকু মায়েরা বসে সংসারিক গল্প করতো,অথবা রেসিপি শেয়ার।ইউ টিউব তখন কল্পনার অতীত।খুব মনে পরে,তখন সলমন খানের সিনেমা “ম্যায়ণে পেয়ার কিয়া” সুপার ডুপার হিট।তাতে আরো হিট অন্ত্যাক্ষরী খেলা।সহজ কথায় গানের লড়াই।লোডশেডিং এর মাঠে আমরা তখন ভীষণ গানের লড়াই খেলতাম।মাঝে মাঝে মা কাকিমারা ও ছোটদের সাথে জুটে যেতেন।সে ছিল ভারি আনন্দের কাল।প্রথম প্রথম ভালো লাগতে শেখা কিশোর চোখ খুঁজতো সেই কিশোরীটিকে যাকে একবার দেখার জন্য কতবার তার বাড়ির সামনে দিয়ে সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করেছে অকারণে।সেই সময়তাইবাইরে অন্ধকার থাকলেও অন্তরে প্রজ্জ্বলিত থাকতো আনন্দের মশাল। পাড়ার বন্ধুদের আমরা বন্ধুই ভাবতাম।অবাধ যাতায়াত ছিল।ঝগড়া ঝাটি হলে, নিজেরাই মেটাতাম,কোনোদিন বাবা মা হস্তক্ষেপ করতো না।ধীরে ধীরে বড়ো ক্লাস এ উঠলাম। লোডশেডিং এর আলোকবৃত্ত  ধীরে ধীরে ছোট হতে লাগলো।উত্তরবঙ্গ বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ার সময় কোনো কোনোদিন লোড শেডিং হলে আমার রুম মেটের  সাথে অন্ধকারে আড্ডা জমত।একটা মোমবাতি জ্বলতো ঘরে।বাইরের জানালা দিয়ে দেখা যেত জোনাকির সমুদ্র।পি জি ক্যান্টিনের ছোট ছেলেটা সেই অন্ধকারে ভাওয়াইয়া গান করতো গলা খুলে।আমরা দুই বান্ধবী তন্ময় হয়ে শুনতাম।আমাদের জীবন থেকে এখন  হারিয়ে গেছে লোডশেডিং নামক প্রতিদিনের নিখাদ বিনোদন।প্রযুক্তি আমাদের সবই দিয়েছে, কিন্তু বড়ো আত্মকেন্দ্রিক,নিভৃতচারি করে তুলেছে।যোগাযোগের সমস্ত মাধ্যম আমাদের হাতের কাছে থাকা স্বত্বেও আমরা আজ একা ,ভীষণ ভাবে একা।এ যেন আলোকবৃত্তের মধ্যে লোডশেডিং।

60