কুলিক রোববার: স্মৃতি: ৫৭

সাধন দাস

লবঙ্গ প্রেম 

মা একদিন হাতেনাতে ধরে ফেললেন। ঠাকুমা কাচের বোয়েম খুলে মুঠো মুঠো লবঙ্গ চুরি করছেন। ছোটকা জাহাজী লোক। বিদেশ থেকে বোয়েম ভর্তি লবঙ্গ এনেছে। বিদেশের মহার্ঘ লবঙ্গ। খাওয়ার চেয়ে মানুষজনকে দেখাবার বেশি। সংসারের আভিজাত্য। ফের না চুরি হয়ে যায়, বাইরের ঘর থেকে বোয়েম মা নিজের এক্তিয়ারে রান্নাঘরে নিয়ে এলেন। চোখ পাকিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিলেন, এই বোয়েমে কেউ হাত দিলে, হাত মুচড়ে ভেঙে দেবেন। 

ঠাকুমা রোজ কীর্তন, পাঠের আসরে যান। সখা সখিদের একটা করে লবঙ্গ দান করেন। তাঁর মাহাত্ম্য বাড়ে। শম্ভুর মুদিখানা থেকে মা দানের লবঙ্গ আনিয়ে দিলেন। ঠাকুমার ভক্তি গেলো উড়ে। মাদাগাস্কারদ্বীপের লবঙ্গ ছেড়ে শম্ভুর লবঙ্গ! কীর্তন পাঠের আসরে তাঁর মাহাত্ম্য আর কী থাকলো? নাটমন্দিরে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। 

রাতে আমি ঠাকুমার কোলে শুই। রাধাকৃষ্ণের গল্প শুনি। আমি কালো। ঠাকুমা আমাকে ‘কৃষ্ণ’ নামে ডাকে। ঠাকুমা ফর্সা, আমি ঠাকুমাকে মনে মনে রাধা ভাবি। পাঠের আসর থেকে নতুন গল্প আসা বন্ধ হয়ে গেলো। আমার একান্ত প্রেম হাহাকার করে উঠলো। 

আঠারো জনের সংসারে রোজ দু’টাকা বারো আনা দেওয়া হয়, ঠাকুমা মাছ, সবজি বাজার করেন। আমার স্কুলের টিফিন খরচ প্রতিদিন পাঁচ নয়াপয়সা। ঠাকুমা আমি দু’জনে যুক্তি করে বাজার আর টিফিন খরচ থেকে পয়সা চুরি করি। জমাই। সংসারের মতো অবিকল একটা বোয়েম কিনে লুকিয়ে রেখেছি। চুরির পয়সায় লবঙ্গ কিনে বোয়েমটাতে রাখি। বোয়েম ভর্তি হলো। দু’জনা মিলে আভিজাত্যের লবঙ্গ ভর্তি বোয়েম চুরি করে আমাদের নকল বোয়েম একই জায়গায় রেখে এলাম। যে লবঙ্গ কাজে লাগে না সে থাকলেই বা কী, না থাকলেই বা কী! ঠাকুমা মা ওই মাহাত্ম্যের লবঙ্গ নিয়েই ফের কীর্তন পাঠে গেলেন। নতুন গল্পে রাধা কৃষ্ণের প্রেম জমে উঠ্লো। 

71