কুলিক রোববার: স্মৃতি : ৫৬

সাধন দাস

ঘর ছাড়লাম ৩ 

দুই তাড়া খাওয়া প্রাণী, রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। পিছনে বিশাল সাদা দোতলা, নিজেদেরই বাড়ি। কতোদিন ভালো করে দেখিনি, গায়ে কতো ময়লা জমেছে! কপালে সিমেন্ট জমিয়ে আঁকা উদীয়মান সূর্যের কেন্দ্রে, সিমেন্ট জমিয়ে বড়ো বোল্ডে লেখা ‘মা’। মলিন দেখাচ্ছে। কর্ণিক তুলির মতো ধরে সিমেন্ট কেটে কেটে আমিই লিখেছি, বহুদিন আগে। মায়ের মুখের মতো ঝাপসা দেখাচ্ছে। লেখা সুন্দর বলে বাবা লিখতে সাহস জুগিয়েছিলেন। তিন মাথার মোড়ে আমাদের বাড়ি। আর আমাদের নেই। সামনে তিন দিক খোলা। হা হা স্বর্গ মর্ত পাতাল। কোনদিকে যাবো? 

কাল সরস্বতীপুজো। বাতাসে পবিত্র ঠাণ্ডা। হিমেল রোদ্দুর এসে পড়েছে বাড়ির গলিতে। ভাইবোন মিলে সরস্বতী পুজো করতাম এখানে। বাঁশ পুঁতে চট টাঙিয়ে প্যাণ্ডেল বানাতাম। মা কাকিমারা ইস্ত্রি করা শাড়ি বের করে দিতো প্যাণ্ডেল সাজাতে। সবচেয়ে সরু সূঁচে খুব সাবধানে আলতো করে, যেনো মায়েদের শাড়ির গায়ে যেনো কোথাও আঁচড় না লাগে, শ্রদ্ধার যত্নে জুড়ে জুড়ে প্যাণ্ডেল সাজাতাম। সেই মায়েরা ষড়যন্ত্র করে রূপাকে, আমাকেও তাড়িয়ে দিলো। বাবা রূপাকে ‘মা’ ছাড়া ডাকতেন না। বলতেন, ‘মা সরস্বতী’। কাল সরস্বতী পুজো। ‘মা সরস্বতী’ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ছেলে, ছেলের বৌকে হারিয়ে মা এখন হয়তো মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সত্যিই কাঁদছে। বৌমাকে যুদ্ধে হারানোর অহংকার আর ছেলে হারানোর পরাজিত স্নেহ মেশানো কান্না। বাংলায় ‘হারানো’ শব্দের কী দ্যোতনা!

জীবন সরকার। মজার নাম! অফিসে আমরা রসিকতাও করি। রুরাল ডেভেলপমেন্ট অফিসার। লম্বা ছুটিতে যাচ্ছেন। তাঁর ব্যাচেলরের টু রুম ফ্ল্যাট। দ্বিতীয় ঘরটা পড়েই থাকে। সাগ্রহে থাকতে দিলেন। ঘরখানার লাগোয়া গোয়াল। সেখানে একটা জার্সিগাভী আর তার বিচুলি ভরা মরা বাছুর থাকে। বাড়ির মালিক শিক্ষক। ওই গোয়ালে বিনিপয়সায় ছাত্র পড়াতেন। তাঁর নিজের কথায়, গোরু পিটিয়ে মানুষ করতেন। টিউশনের পাট তুলিয়ে জীবনস্যার তাঁকে গোরুর দুধের ব্যবসাদার বানিয়ে ছেড়েছেন। জীবনস্যার বলতেন, গরু পিটিয়ে কোনো দিন মানুষ হয় না। গরুর দুধ দেওয়াই কাজ। দুধই দেয়। স্যারই ব্যাঙ্কের লোনে গোরুজোড়া কিনিয়ে দিয়েছেন। বাছুর মরে গেলে তার হাড় মাংস বের করে খড় ভরে খাড়া করার বুদ্ধিও দিয়েছেন। সকাল বিকেল দুধ দোহানোর সময় মরা বাছুরটাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। মরা বাচ্চাকে জ্যান্ত ভেবে মা গা চেটেচেটে স্নেহে অন্ধ হয়ে মালিককে দুধ দেয়। আমার চক্ষুষ্মান মা নিজের ছেলেকে, বৌকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অন্ধ মায়ের কাছে থাকতে এসেছি। 

পাশেই বদ্ধজলা। মশারদল সন্ধ্যে হতেই সশব্দে বেরিয়ে এলো। রাত বাড়ছে। ঠাণ্ডা বাড়ছে। মশা বাড়ছে। গুণগুণ গান ক্রমশঃ গোঁ গোঁ ঝড়ে বদলে যাচ্ছে। মশার হুল থেকে বাঁচতে, ঘরের কোণে ছিলো টেবিল ফ্যান, উপায় না দেখে এই কনকনে ঠাণ্ডায় দিলাম চালিয়ে। আর ঠাণ্ডা থেকে রেহাই পেতে এক কম্বলে জড়াজড়ি করে দু’জন ঘরের কোণে বসে রাত কাটিয়ে দিচ্ছিলাম। অন্ধকার কিছুতেই কাটছে না। ঘরের পেছন থেকে গাভীর চোনানোর গভীর শব্দ পেলাম। ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ। গোরু নাদলো। নাদ পড়লো পেচ্ছাপের উপর। থপ থপ থ থ থ প…। মজা পাচ্ছি। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসছি। মশার কামড় সহ্য করতে না পেরে গোরুটা কাতরাচ্ছে। মনে হলো খুব কষ্টে বই পড়ছে। অ… অ… আ… । মশা তাড়াতে ল্যাজ ঝাপটাচ্ছে। আমরাও ঠাণ্ডা আর মশার কামড়ে অস্থির হয়ে মাঝ রাত্তিরে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লাম। ঘরের পিছনেই গোয়াল। গোয়ালের আড়ায় মরা বাছুরটা কাত হয়ে পড়ে আছে। 

রূপা বললো- বেচারা মশার কামড়েই মরেছে নির্ঘাত। 

গোয়ালের মুখে অর্ধেক গোবর জলে নিকিয়ে পরিষ্কার। একটা টিমটিমে বাল্ব জ্বলছে। রঙবেরঙের শাড়ি দিয়ে তৈরি হয়েছে প্যাণ্ডেল। গোয়ালে বিদ্যাদেবীর আরাধনা হবে। বেদীতে সরস্বতীর সাদা মূর্তি বসে গেছে। দেবীর গায়ে অজস্র মশা। প্রতিমাকে প্রায় কালো করে ফেলেছে। রূপা ভিতরে ঢুকে উঁকি মেরে দেখছে। প্যাণ্ডেলের অর্ন্তরাত্মায় গোবরে চোনা-কাদায় মাখামাখি হয়ে গোরুটা শুয়ে আছে। গায়ে ভর্তি মশা। চোনা গড়িয়ে চলে আসছে সরস্বতীর আসনের নিচে। রূপা ফ্যাচ করে চোনায় পা ফেলে কাদা মাখামাখি হয়ে গেলো। আমি আর হাসি চাপতে পারলাম না। রূপা আর প্রতিমার সামনে দুই হাত জোড় করে বলে উঠলাম- নমঃভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ। বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত বিদ্যা স্থানেভ্য এব চ। 

রূপা ঠাকুর দেবতা বিশ্বাস করে না। আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। 

54