প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথের শিশুকাব্য

বিপুল মৈত্র

শৈশবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত নিঃসঙ্গ।আর এই কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন কল্পনাবিলাসী। শৈশবে তিনি বিভিন্ন নিয়মের নিগড়ে বদ্ধ ছিলেন। শৈশবকে একান্ত করে উপভোগ করা হয়ে ওঠেনি তাঁর। শৈশব না পাওয়া পরবর্তী কালে অতীতচারনের মাধ্যমে তিনি ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন–
” আমিও ছিলেম একদিন ছেলেমানুষ ‌।
আমার জন্যেও বিধাতা রেখেছিলেন গড়ে
অকর্মণ্যের অপ্রয়োজনের জল স্থল আকাশ
তবু ছেলেদের সেই মস্ত বড়ো জগতে
মিলল না আমার জায়গা ।”
শিশু এবং মা শব্দ দুটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রবীন্দ্রনাথের শিশুকাব্যে শুধুমাত্র শিশু উপভোগ্য কবিতা রয়েছে তা নয়। এর মধ্যে একটি ধারার কবিতা রয়েছে যেখানে শিশুমনের বিচিত্র রূপের প্রকাশ ঘটেছে আর অপর ধারাটিতে শিশুর আশ্চর্য রহস্যময় রূপ আত্মপ্রকাশ করেছে। এই জাতীয় কবিতাগুলিতে মায়ের চোখে শিশুর স্বর্গীয়রূপ প্রতিভাত হয়েছে।
মা উপলব্ধি করেন তার খোকা–
” সব দেবতার আদরের ধন
নিত্যকালের তুই পুরাতন
তুই প্রভাতের আলোর সমবয়সী–“
আবার মা’র কাছে শিশু যেন পার্থিব হয়েও স্বর্গীয়। মা এই সত্য অনুধাবন করেই বলছেন —
” খেলতে গিয়ে কাপড়খানা
ছিঁড়ে খুঁড়ে এলে
তাই কি বলে লক্ষ্মীছাড়া ছেলে।
ছিছি, কেমন ধারা।
ছেঁড়া মেঘে প্রভাত হাসে
সে কি লক্ষ্মীছাড়া।”

শৈশব কালে মাতৃলালনের ক্ষোভ ছিল রবীন্দ্রনাথের। তাঁর সৃষ্ট শিশুচরিত্র তাই তাঁর মতোই মাতৃ ব্যাকুল ও অভিমানী।
তাই তো ‘ বীরপুরুষ ‘ খোকা তার কাহিনী শুরু করেছে এই বলে–
” মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে। “
‘ নৌকাযাত্রা’ তে এই খোকাই আবার রাজপুত্র হয়ে
‘ সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার ‘ যেতে চাইছে। কিন্তু সে যাত্রা বহুদিনের জন্য নয়। মাকে ছেড়ে, মায়ের সেন্হাঞ্চলটুকু উপেক্ষা করে বেশিক্ষণ খোকা থাকতে পারে না। তাই সে বলে —
” ভোরের বেলা দেব নৌকা ছেড়ে
ফিরে আসতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে,
গল্প বলব তোমার কোলে এসে। “

সব শিশুই মাতৃবৎসল । কিন্তু কোন খোকা না ছোটবেলায় বাবার মতো বড়ো হবার স্বপ্ন দেখে।
এমনই স্বপ্ন- দেখা একটি খোকাকে পাই ‘ ছোটবড়ো’
তে। খোকা বলে —
” এখনো তো বড়ো হয়নি আমি
ছোটো আছি ছেলেমানুষ বলে।
দাদার চেয়ে অনেক মস্ত হবে
বড়ো হয়ে বাবার মতো হলে।”
এরকম অনেক ভাব প্রকাশ রয়েছে রবীন্দ্রনাথের তাঁর শিশুকাব্যে।
খোকার কথা শিশুকাব্যে বেশি করে থাকলেও ‘ খুকি’র কথা রয়েছে ‘ বিজ্ঞ ‘, ‘ হাসিরাশি ‘, ‘ পরিচয় ‘ , ‘ পাখির পালক ‘ , কবিতাগুলিতে।
‘ খুকি’র কথা কম থাকা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ মোহিতচন্দ্র সেনকে একটি পত্রে লিখেছেন– খোকা এবং খোকার মার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ মধুর সম্বন্ধ , সেইটে আমার গৃহস্মৃতির শেষ মাধুরী– তখন খুকি ছিল না- মাতৃশয্যার সিংহাসনে খোকাই তখন চক্রবর্তী সম্রাট ছিল।
মা আর খোকার কথা যেমন বর্নিত হয়েছে তাঁর শিশুকাব্যে, তেমনি বর্নিত হয়েছে শৈশবে সব শিশুর স্বপ্নময় দিনগুলোর কথা–
মনে পড়েছে তাঁর —
” মেঘের খেলা দেখে কত
খেলা পড়ে মনে।
কতদিনের লুকোচুরি
কত ঘরের কোণে।
তার সঙ্গে মনে পড়ে
ছেলে বেলার গান
‘ বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
নদেয় এর বান। “

শিশুর মন বিচিত্র ধারায় প্রবাহিত হয়। রবীন্দ্রনাথো তার ব্যতিক্রম নন। তাই শিশুমাত্র ই যেমন চায় মাস্টার হয়ে কল্পিত ছাত্রকে শাসন করতে, তাঁর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ‘ মাস্টারবাবু ‘ কেও খুঁজে পাওয়া যায় ছেলেবেলার বর্ননায়। রবীন্দ্রনাথ বলছেন–
‘ পাল্কির বাইরে এক-একদিন ছিল আমার মাস্টারি; রেলিঙগুলো ছিল আমার ছাত্র, ভয়ে থাকত চুপ। এক-একটা ছিল ভারী দুষ্ট, পড়াশোনায় মন নেই; শিশুকাব্যের মাস্টারবাবুরো সেই একই কথা।
সে বলছে–
” আমি আজ কানাইমাস্টার,
পোড়ো মোর বেড়ালছানাটি।
… দিনরাত খেলা খেলা খেলা,
লেখায় পড়ায় ভারি হেলা । “
এভাবেই কবি তাঁর শৈশব না পাওয়ার ক্ষোভ, অপূর্ণতাকে পূর্ণ করেছেন তাঁর শিশুকাব্যের মধ্য দিয়ে।

58