কুলিক রোববার স্মৃতি: ৫৫

সাধন দাস

বাড়ি ছাড়লাম ২

প্রেম করেছি ছাত্রীর সাথে। পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে গেছে। মা বললো- পাড়ায় কান পাতা যাচ্ছে না। 

বাবা বললেন- মেয়ে পছন্দ করেছো নিজে। যেভাবে পারো তোমার বিয়ে তুমি করে এসো। আমি দেবো না। মেয়ে আমার পছন্দ। ঘরে তুলে নেবো। 

তুলসিদা রমেশদা আমাদের বিয়ে দিলেন। ( আগের স্মৃতিচারণে পড়েছেন।) বৌ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। 

রূপার হেডমিসট্রেস বাবাকে বলে গেছেন- হীরের টুকরো মেয়ে। কোনো ক্লাসে, কখনো, কোথাও, সেকেণ্ড হয়নি। পরিশ্রমী, বুদ্ধিমতী। ওর পড়াশুনো ছাড়াবেন না। মা সরস্বতী যাচ্ছে আপনার ঘরে। দেখবেন, ওর গুণে সংসার আলোয় ভরে উঠবে।  

বাবা লেখাপড়াকে খুব মান্য করতেন। বৌমাকে কলেজে ভর্তি করে দিলেন। অথচ মা দুর্বোধ্য! বিয়ের আগে রূপা যখন আমার কাছে পড়তে আসতো, মা ওকে মেয়ের মতো ভালোবেসেছে। ওরা গরিব। মা’র মনে হতো, মেয়েটা হয়তো না খেয়েই স্কুলে যায়। পেট ভরে খাইয়ে স্কুলে পাঠাতো। বিকেলে আসলে, কোলের সামনে বসিয়ে রুক্ষ্ম চুলে তেল মাখিয়ে, চুল আঁচড়ে, লাল ফিতে দিয়ে সাজিয়ে, একটা চুমু খেয়ে আমার কাছে পড়তে পাঠাতো। সেই মেয়েই বৌমা হয়ে এলে, কী জানি কী হলো? পাশা উল্টে গেলো। যে স্নেহে দয়া ছিলো, সেই স্নেহে অধিকার দিতে মা রাজি হলো না। মনে মনে বিরুদ্ধতা এতো তীব্র ছিলো, বরণ করে ঘরে তোলার সময় নতুন বালা টেনে হেঁচড়ে এমন পড়িয়ে দিলো, হাতের ছাল চামড়া উঠে রক্ত বেরিয়ে গেলো। বোনও স্কুলে পড়ে। বৌদি ননদে গলায় গলায় ভাব। এক সাথে সংসারের কাজ সারে, পড়াশোনা করে, আড্ডা মারে, সিনেমায় যায়। ওদের সমস্যা নেই। 

কিন্তু সেদিন অফিস বেরুচ্ছি। রূপা সাথেই যাচ্ছে, দু’জনই ট্রেন ধরবো। ও কলেজে যাবে। চারদিকে ঝলমলে রোদ্দুর। ফুরফুরে বাতাস। রান্নাঘরের বারান্দায় বাবা সকালের খাবার খেতে বসেছেন। কানের কাছে দাঁড়িয়ে মা বললো- আমার মেয়ে ছেঁচেয় বসে বাসন মাজবে আর বাড়ির বৌ ব্যাগ ঝুলিয়ে কলেজে যাবে সে হবে না। 

সকালটা বিষিয়ে দিলেন মা। রেগে মেগে অস্থির বাবা আমাকে বললেন- তোদের আর থাকার দরকার নেই। বেরো তোরা বাড়ি থেকে। দিনরাত অশান্তি ভালো লাগে না। 

প্রথমে বুঝতে পারিনি। ভাবলাম, বাবা তাড়াতাড়ি অফিসে, কলেজে চলে যেতে বলছেন! 

মেজকাকাদের আলাদা সংসার, তবু ঘরের জানলা দিয়ে নাক গলিয়ে বললেন- হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের বাড়ি ছাড়াই ভালো। ওরাও সুখে থাকবে। বাড়িতেও শান্তি হবে।   

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। বুঝলাম আমাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এবং ষড়যন্ত্র আগে থেকেই চলছে।   

মাথা নিচু করে ম্লান গলায় জিজ্ঞেস করলাম- বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবো, বাবা?  

– যেখানে খুশি। চাকরিতে ট্রান্সফার হলেও তো চলে যাবি। 

একটু চুপ থেকে বাবা বললেন- পারিস তো বৌমাকে পড়াস। মেয়েটা পড়তে ভালোবাসে। হেডমিসট্রেস নীহারদি বলেছিলেন, মা সরস্বতী। 

গলাটা ভারী মনে হলো। বাবা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। 

মা হিসহিসিয়ে বললো- হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই যা। মা, বোন আগুন পুড়ে জলে ডুবে মরুক। কারো দেখার দরকার নেই।  

বাবা আর একটি কথাও বলেননি। যা মাইনে পাই সব তাঁর হাতে তুলে দিই। তিনি মাসের পকেট খরচা দেন। 

মুখ ফুটে বলতে পারলাম না- বাবা আমি নিঃস্ব। পকেট শূন্য। থাকবো কোথায়? খাবো কী? 

দুঃখে, জেদে সেই খালি হাত পায়েই বেরিয়ে পড়লাম। উনুনের আগুন আড়াল করে মা রান্নাঘরের দরোজায় ট্রাফিক পুলিশের মতো দাঁড়িয়ে ছিলো। আগুনের আভা লেগে তার লালচে শাড়ি গেরুয়া রঙ ধরেছে। আলুথালু চুলে মাকে সন্ন্যাসীনি দেখাচ্ছে। রান্নাঘরের অন্ধকারে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মেজোকাকিমা, মাকে সান্তনা দিচ্ছে। মেজোকাকিমার মুখে আঁচল চাপা দেওয়া। দেখতে পেলাম, আঁচলের নিচে তিনি ঠোঁট টিপে হাসছেন! বুঝলাম, ঘটনার ব্লু-প্রিন্ট এখান থেকেই তৈরি হয়েছে। আজ অপারেশন সাকসেসফুল হলো। রূপা মাথা নিচু করে মাকে প্রণাম করলো। প্রণাম করতে কষ্ট হচ্ছিলো। সন্তান ওর পেটে। মায়ের আগুনচোখ রূপার দিকে। আমিও মাকে প্রণাম করলাম। মায়ের পায়ে হাত রেখে মনে মনে মিনতি করেছিলাম, মাগো তাড়িয়ে দিও না। এখন তোমাকে খুব দরকার। ওর প্রথম সন্তান, তোমাদের প্রথম নাতি/ নাতনি কিছু একজন আসছে।  মুখ ফুটে বলতে পারিনি। কান্না ভেজা অস্ফুট গলায় বললাম- যাচ্ছি মা। 

মা কোনো উত্তর দিলো না। 

মেজকাকার বাড়িতে টেপরেকর্ডারে গান বাজছে, অকূল দরিয়ার মাঝি বাইয়া যাও রে…   

46