
সাধন দাস
বদর বদর ৫
(গোপাল কথা)
– এক পয়সা, এক নয়াপয়সা দিয়ে রৌরবের শেষ সংখ্যাটি সংগ্রহ করুন আর বইমেলা (১৯৮৬) শেষ ঘোষণা করতে দিন।
তাবৎ রৌরবিয়ান চেঁচিয়ে লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন মাতিয়ে তুলেছে। অনেকে এগিয়ে এলেন। পাঁচ দশ কুড়ি পয়সা বের করতে ব্যস্ত।
– উঁহু, আমাদের এক নয়াপয়সাই চাই।
নেই, তবু কেউ টেবিল ছেড়ে নড়ছেন না! আমাদের সাথে গলা মেলাচ্ছেন। ভীড় জমে যাচ্ছে। সবাই মজা পাচ্ছেন। শেষে সত্যিই একজন (চন্দন নন্দী, ৪জি প্রাণনাথ চৌধুরী লেন, কোলকাতা-২) একটি এক নয়াপয়সার বিনিময়ে সংখ্যাটি পেয়ে গেলেন। অমনি বেজে উঠলো ফাঁকা টেবিল, খালি বইয়ের ট্রাঙ্ক, কাঁধের ব্যাগে শূন্য টিফিন কৌটো। বহরমপুর থেকে আনা থালা, বাটি, গেলাশ। মেলা ছেড়ে যাওয়ার আগে ফি বছরের মতো বেরিয়ে পড়লো রৌরবের মিছিল। চক্কর দিয়ে গাইছি, উই শ্যাল ওভারকাম… আর রৌরবিয়ানদের মিছিল ক্রমেই বড়ো হচ্ছে।
‘আলবেলিয়া বিশেষ সংখ্যা’ (জানু, ১৯৯০) বইমেলাতে বেরিয়ে ঝড়ের বেগে নিঃশেষ। মেলাতেই সিদ্ধান্ত হলো, আলবেনিয়া টু বেরুবে এবং বহু টাকা ধার দেনা করে বেরুলো টু (সেপ্টে, ১৯৯০)। হাফ ডেমি, ১২০ পাতা। ঢাউস সংখ্যা। বিক্রি করে টাকা তুলতে হবে। কলেজস্ট্রিটে নতুন, পুরনো পাতিরাম, বুক মার্ক অন্যান্য বিক্রির কাউন্টারে সংখ্যাটি ছড়িয়ে দেওয়া হলো সংখ্যাটি। গোপাল, আমি রোজ অফিস ফেরতা বিক্রিবাটা তদারকি করি।
সেদিন পাতিরামে যেতেই শুনলাম, ‘আলবেনিয়া টু’ নিয়ে পালিয়ে যান। মাও সে তুং পন্থীরা হুমকি দিয়েছে পেলেই আমাদের কচুকাটা করবে। রৌরব দেখলেই আগুন লাগিয়ে দেবে। ‘রৌরব নিপাত যাক’ পোস্টারও দেখলাম। বুক মার্কের কাউন্টারে একজন শত্রুপক্ষ, তিনি আমাদের দু’জনকে আগুন চোখে মেপে নিলেন। দুই বাণ্ডিল রৌরব কাঁধে বিপদের মধ্যে দু’জন ছুটছি। কী মজা! আনাস্বাদিত অপূর্ব আনন্দ। দু’জন পেছনে তাড়া করেছে। ভীড় গলিয়ে লুকোচুরি খেলছি আর খিলখিলিয়ে হাসছি। পায়ে জোর বেড়ে যাচ্ছে। অবশেষে লাফ মেরে চলন্ত ট্রামে।
সম্পাদকীয়তে পরিষ্কার লেখা আছে, ‘এ কথাটি ভেবে নেওয়া একেবারেই ভুল হবে যে আমরা আলবেনিয়াপন্থী।…’ উত্তেজিত মাও ভক্তগণ সংখ্যাটির শুরুর পাঠেও রুচি বোধ করেননি। সূচিতে, আলবেনিয়া প্রধান এনভার হোজার “মাও সে তুং চিন্তা- একটি মার্ক্সবাদ বিরোধী তত্ব” [নাসের(হোসেন)এর অনুবাদ] লেখাটি দেখেই মাথা গরম করে ফেলেছেন।
আলবেনিয়া টু জমা হলো গোপালের বাড়ি।
কোলকাতা থেকে আমার ট্রান্সফার হলো। গোপাল একা হয়ে গেলো। ধারদেনার এই ধাক্কাতেই রৌরবের ভিত নড়ে যায়। রৌরব প্রকাশ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এরপর যখন এক আধবেলার কাজে কোলকাতায় গেছি, দেখেছি, কোনো আক্রমণের তোয়াক্কা না করে, ঋজু সাহসী গোপাল একা কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতে শতরঞ্চি বিছিয়ে আলবেনিয়া টু বিক্রি করছে। বইমেলার মাঠেও দেখেছি, ছড়ানো রৌরবের মাঝে একা একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে মেরুদণ্ড সোজা গোপাল আলবেনিয়া টু বিক্রি করে চলেছে। যতটুকু সময় পেয়েছি ওর শতরঞ্চিতে বসে নিজের অপরাধ স্খালন করেছি।
